ঢাকা ০৬:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কুকুর বা বিড়াল হত্যায় ৬ মাসের জেল, যা আছে আইনে

বাংলা টাইমস ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:১২:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ৬৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আটটি কুকুর ছানাকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে হত্যার ঘটনা সারা দেশের মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে। সন্তান হারিয়ে মা কুকুরের ছোটাছুটি এবং আর্তনাদের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্যবার শেয়ার হয়েছে।

রোববার (৩০ নভেম্বর) ৮টি কুকুর ছানা নিখোঁজের ঘটনাটি ঘটেছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদ কোয়ার্টার কমপ্লেক্সের সামনে। ওইদিন রাত থেকেই শুরু হয় মা কুকুটির আহাজারি।

পরদিন সোমবার সকাল থেকেই ওলানভর্তি দুধ নিয়ে মা কুকুর খাবার খাওয়াতে সদ্যোজাত সন্তানদের খোঁজে এদিক সেদিক ছুটতে থাকে আর চিৎকার করতে দেখা যায়। মাত্র সপ্তাহখানেক আগেই মা পথকুকুরটি ওই ছানাদের জন্ম দিয়েছিল। কোয়ার্টারের একটি ভবনের নিচেই জন্মের পর ছিল বাচ্চাগুলো।

দুইদিনে মা কুকুরের আর্তনাদেই কুকুর ছানা নিখোঁজের বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেয় উপজেলা প্রশাসন।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, প্রথমদিন বুঝতে না পারলেও পরে খোঁজ নিয়ে পরে জানা যায়, কুকুরটির আটটা বাচ্চাকে একটা বস্তাতে ভরে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ওই কোয়ার্টারে অন্যান্য স্টাফদের কাছে ওই মহিলার ছেলেই বস্তাবন্দি করে কুকুরের বাচ্চাগুলোকে পানিতে ফেলার বিষয়টি জানায়। পরে পার্শ্ববর্তী একটি পুকুর থেকেই কুকুর ছানাগুলোকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সেগুলো এরই মধ্যে মারা গেছে।

যিনি কুকুর ছানাগুলোকে মেরেছেন তিনি আরেকজন সরকার কর্মকর্তার স্ত্রী বলে জানান তিনি। এই ঘটনায় কোয়ার্টার থেকে ওই সরকারি কর্মকর্তার বরাদ্দ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে, দুগ্ধবতী মা কুকুরটিকে চিকিৎসার জন্য লাইভস্টক কর্মকর্তার অধীনে দেওয়া হয়েছে।

“যেহেতু বাচ্চার দুধ নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে, দুধ আসতেছে, ব্যথা করছে। এগুলো আমরা ট্রিটমেন্ট করছি” বলেন মি. মনিরুজ্জামান।

এর আগে, গত বছরের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে আবাসিক এলাকা জাপান গার্ডেন সিটিতে পথকুকুর বা বিড়ালকে বিষ প্রয়োগে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে।

ওই সময় অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তত দশটি কুকুর ও বিড়ালের মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে মাঠে নামে প্রাণী অধিকার কর্মীরা।

এর আগে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে চট্রগ্রামে বিষ প্রয়োগ করে শত শত কুকুরকে হত্যা করার অভিযোগ ছিল। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, মালিকবিহীন এসব পথকুকুর বা বিড়ালকে হত্যা, নির্যাতন বা আঘাত করলে আদৌ শাস্তির বিধান আছে কিনা?

পথকুকুরের নিরাপত্তা বা আইনি প্রতিকার সাধারণ ব্যক্তি নিজে চাইতে পারবে কি না? নাকি পুলিশই নিজে থেকে ব্যবস্থা নিতে পারবে?

গত চৌঠা নভেম্বর বগুড়ার দত্তবাড়িয়ার গুচ্ছগ্রামে একটি বিড়ালকে জবাই করে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি সংগঠন পরদিন আদমদিঘী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে। এই সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য মো. এমরান হোসেন এই জিডিটি করেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিওতে একজন মহিলার একটি বিড়ালকে জবাই করে হত্যার ভিডিও দেখে পরদিন বগুড়াতে যান তিনি।

প্রাণি হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি কী?

প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ করা, সদয় আচরণ প্রদর্শন করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালের প্রাণি কল্যাণ আইনটি প্রণয়ন করা হয়।

আইনজীবীরা বলছেন, এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ নন-কগনিজেবল বা অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য।

পোষ্য এবং মালিকবিহীন দুই ক্যাটাগরিতে প্রাণিকে ভাগ করা হয়েছে এই আইনে। এই আইনে উল্লেখিত কোনো কারণ ব্যতীত মালিকবিহীন কোনো প্রাণিকে নিধন বা অপসারণ করা যাবে না।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, মালিকবিহীন কোনো প্রাণি, যেসব কুকুর বা বিড়াল পোষা নয়, এমন পথকুকুর বা বিড়াল এমন প্রাণীকে কেউ যদি হত্যা করে তবে সেটা হবে অপরাধ, এই অপরাধে শাস্তির বিধানও আছে।

প্রাণির প্রতি কি কি আচরণ নিষ্ঠুর হিসেবে বিবেচনা করা হবে তা এই আইনের ছয় ও সাত ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অঙ্গহানি করা এবং বিষ প্রয়োগে প্রাণি হত্যাকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে যদি কোনো প্রাণি সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকলে বা অনিরাময়যোগ্য অসুস্থ হলে, তাকে বাঁচিয়ে রাখা নিষ্ঠুরতা বলে মনে হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ক্রমে ব্যথাহীন মৃত্যু ঘটানো যাবে।

এছাড়া পোষ্য বা পথকুকুর বা বিড়ালকে হত্যা, নির্যাতন বা তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করার আইনে সুযোগ নাই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যদি কেউ এ সমস্ত ঘটনা করে তবে তার জন্য ছয়মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা জরিমানা। আর যদি দ্বিতীয়বার করে তাহলে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা.. এই শাস্তির বিধানটাও আছে । এই শাস্তি পোষ্য এবং মালিকানাবিহীন বা পথকুকুর বা বিড়াল উভয়ের জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য।

তিনি জানান, এই আইনের অধীনে প্রাণির প্রতি যেসব অপরাধের কথা বলা হয়েছে সেগুলোর বিচার করতে পারবে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্টও।

বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রাণি কল্যাণ আইন অনুযায়ী, প্রাণি হত্যার সর্বোচ্চ সাজা দুই বছরই বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

কুকুর বা বিড়াল হত্যায় ৬ মাসের জেল, যা আছে আইনে

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:১২:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫

আটটি কুকুর ছানাকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে হত্যার ঘটনা সারা দেশের মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে। সন্তান হারিয়ে মা কুকুরের ছোটাছুটি এবং আর্তনাদের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্যবার শেয়ার হয়েছে।

রোববার (৩০ নভেম্বর) ৮টি কুকুর ছানা নিখোঁজের ঘটনাটি ঘটেছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদ কোয়ার্টার কমপ্লেক্সের সামনে। ওইদিন রাত থেকেই শুরু হয় মা কুকুটির আহাজারি।

পরদিন সোমবার সকাল থেকেই ওলানভর্তি দুধ নিয়ে মা কুকুর খাবার খাওয়াতে সদ্যোজাত সন্তানদের খোঁজে এদিক সেদিক ছুটতে থাকে আর চিৎকার করতে দেখা যায়। মাত্র সপ্তাহখানেক আগেই মা পথকুকুরটি ওই ছানাদের জন্ম দিয়েছিল। কোয়ার্টারের একটি ভবনের নিচেই জন্মের পর ছিল বাচ্চাগুলো।

দুইদিনে মা কুকুরের আর্তনাদেই কুকুর ছানা নিখোঁজের বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেয় উপজেলা প্রশাসন।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, প্রথমদিন বুঝতে না পারলেও পরে খোঁজ নিয়ে পরে জানা যায়, কুকুরটির আটটা বাচ্চাকে একটা বস্তাতে ভরে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ওই কোয়ার্টারে অন্যান্য স্টাফদের কাছে ওই মহিলার ছেলেই বস্তাবন্দি করে কুকুরের বাচ্চাগুলোকে পানিতে ফেলার বিষয়টি জানায়। পরে পার্শ্ববর্তী একটি পুকুর থেকেই কুকুর ছানাগুলোকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সেগুলো এরই মধ্যে মারা গেছে।

যিনি কুকুর ছানাগুলোকে মেরেছেন তিনি আরেকজন সরকার কর্মকর্তার স্ত্রী বলে জানান তিনি। এই ঘটনায় কোয়ার্টার থেকে ওই সরকারি কর্মকর্তার বরাদ্দ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে, দুগ্ধবতী মা কুকুরটিকে চিকিৎসার জন্য লাইভস্টক কর্মকর্তার অধীনে দেওয়া হয়েছে।

“যেহেতু বাচ্চার দুধ নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে, দুধ আসতেছে, ব্যথা করছে। এগুলো আমরা ট্রিটমেন্ট করছি” বলেন মি. মনিরুজ্জামান।

এর আগে, গত বছরের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে আবাসিক এলাকা জাপান গার্ডেন সিটিতে পথকুকুর বা বিড়ালকে বিষ প্রয়োগে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে।

ওই সময় অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তত দশটি কুকুর ও বিড়ালের মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে মাঠে নামে প্রাণী অধিকার কর্মীরা।

এর আগে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে চট্রগ্রামে বিষ প্রয়োগ করে শত শত কুকুরকে হত্যা করার অভিযোগ ছিল। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, মালিকবিহীন এসব পথকুকুর বা বিড়ালকে হত্যা, নির্যাতন বা আঘাত করলে আদৌ শাস্তির বিধান আছে কিনা?

পথকুকুরের নিরাপত্তা বা আইনি প্রতিকার সাধারণ ব্যক্তি নিজে চাইতে পারবে কি না? নাকি পুলিশই নিজে থেকে ব্যবস্থা নিতে পারবে?

গত চৌঠা নভেম্বর বগুড়ার দত্তবাড়িয়ার গুচ্ছগ্রামে একটি বিড়ালকে জবাই করে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি সংগঠন পরদিন আদমদিঘী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে। এই সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য মো. এমরান হোসেন এই জিডিটি করেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিওতে একজন মহিলার একটি বিড়ালকে জবাই করে হত্যার ভিডিও দেখে পরদিন বগুড়াতে যান তিনি।

প্রাণি হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি কী?

প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ করা, সদয় আচরণ প্রদর্শন করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালের প্রাণি কল্যাণ আইনটি প্রণয়ন করা হয়।

আইনজীবীরা বলছেন, এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ নন-কগনিজেবল বা অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য।

পোষ্য এবং মালিকবিহীন দুই ক্যাটাগরিতে প্রাণিকে ভাগ করা হয়েছে এই আইনে। এই আইনে উল্লেখিত কোনো কারণ ব্যতীত মালিকবিহীন কোনো প্রাণিকে নিধন বা অপসারণ করা যাবে না।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, মালিকবিহীন কোনো প্রাণি, যেসব কুকুর বা বিড়াল পোষা নয়, এমন পথকুকুর বা বিড়াল এমন প্রাণীকে কেউ যদি হত্যা করে তবে সেটা হবে অপরাধ, এই অপরাধে শাস্তির বিধানও আছে।

প্রাণির প্রতি কি কি আচরণ নিষ্ঠুর হিসেবে বিবেচনা করা হবে তা এই আইনের ছয় ও সাত ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অঙ্গহানি করা এবং বিষ প্রয়োগে প্রাণি হত্যাকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে যদি কোনো প্রাণি সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকলে বা অনিরাময়যোগ্য অসুস্থ হলে, তাকে বাঁচিয়ে রাখা নিষ্ঠুরতা বলে মনে হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ক্রমে ব্যথাহীন মৃত্যু ঘটানো যাবে।

এছাড়া পোষ্য বা পথকুকুর বা বিড়ালকে হত্যা, নির্যাতন বা তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করার আইনে সুযোগ নাই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যদি কেউ এ সমস্ত ঘটনা করে তবে তার জন্য ছয়মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা জরিমানা। আর যদি দ্বিতীয়বার করে তাহলে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা.. এই শাস্তির বিধানটাও আছে । এই শাস্তি পোষ্য এবং মালিকানাবিহীন বা পথকুকুর বা বিড়াল উভয়ের জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য।

তিনি জানান, এই আইনের অধীনে প্রাণির প্রতি যেসব অপরাধের কথা বলা হয়েছে সেগুলোর বিচার করতে পারবে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্টও।

বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রাণি কল্যাণ আইন অনুযায়ী, প্রাণি হত্যার সর্বোচ্চ সাজা দুই বছরই বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী।