২১ লাখ ভবনের বেশিরভাগ ভূমিকম্প সহনীয় নয়, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে ঢাকা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৫৮:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫ ৮০ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীসহ দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ২১ লাখ ভবনের বেশিরভাগ ভূমিকম্প সহনীয় নয়। ভবনের নকশা নয়, নির্মাণ কাঠামো পর্যবেক্ষণে জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশেজ্ঞদের। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে বলে শঙ্কা তাদের।
এদিকে, শুক্রবারের তীব্র ভূমিকম্পের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই গাজীপুরের বাইপাইলে আবারও ভূকম্পন রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র।
শনিবার (২২ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৬ মিনিট ১২ সেকেন্ডে এই ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৩।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রে দায়িত্বরত পেশাগত সহকারী নিজাম উদ্দিন আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, সাভার ও আশুলিয়ার মাঝামাধি বাইপাইলে এর উৎপত্তিস্থল।
এর আগে শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে ১৩ কিলোমিটার পূর্বে নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে দুই শিশুসহ ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এর মধ্যে ঢাকায় ৪ জন, নরসিংদীতে ৫ জন ও নারায়ণগঞ্জে ১ মারা গেছেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশকিছু ভবন।
বিশ্বে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম। ঘনবসতিপূর্ণ এ নগরের ঝুঁকি কমাতে এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ভূমিকম্পের পর প্রতিবার ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেলেও পরে আর নড়চড় থাকে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার ২১ লাখ ভবনের বেশির ভাগই ভূমিকম্প সহনীয় নয়। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ ভবন অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের নকশা নয়, নির্মাণ কাঠামো পর্যবেক্ষণ করা দরকার বলে মত তাদের।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘অনেক ভবনে দেখা যাচ্ছে ডিজাইন ঠিকই আছে কিন্তু যখন তৈরি করা হচ্ছে তখন কোয়ালিটি কন্ট্রোল করা হচ্ছে না। যে কারণে সরকারের মনিটরিং বা তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। বিল্ডিং যখন হচ্ছে তখন তদারকি করতে হবে।’
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবীর বলেন, ‘বাংলাদেশকে আমরা যদি উচ্চমাত্রার ঝুঁকি বলি– সেক্ষেত্রে ভূমিকম্পের ঝুঁকির তিনটি অঞ্চল বা জোন ধরা হচ্ছে। উত্তর ও উত্তর–পূর্বাঞ্চল উচ্চঝুঁকিপ্রবণ, কেন্দ্রীয় বা মধ্যাঞ্চল মাঝারি ঝুঁকিতে আর দক্ষিণাঞ্চলে ঝুঁকি সর্বনিম্ম।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে।
২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল দুপুরে উৎসে ভূমিকম্পের রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। স্থায়িত্ব ছিল ২৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড। সেদিন রংপুরের অধিকাংশ মানুষ ভয়ে বাসা-বাড়ি, অফিস ও দোকানপাট ছেড়ে রাস্তা ও খোলা মাঠে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
একই বছরের ৫ জানুয়ারি ভোরে দুই দফায় ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রংপুর নগরী এবং ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটে প্রায় সোয়া মিনিট কম্পন হয়, যার রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮।
রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশকে ভূ-কম্পনের তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। এরমধ্যে সিলেট এক নন্বরে।
দ্বিতীয় স্থানে রংপুর। বিশেষ করে যুমার উপারে মধুপুর ফল্ট ও শিলং ফল্ট এর মাঝামাঝি রংপুর হওয়ায় ঝুঁকি বেশি।’
আবহাওয়া অফিস বলছে, ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত এ অঞ্চলে ১৮৫ বার ভূমিকম্প হয়েছে। ২০০৭ সালে ২৫ বার এবং ২০০৮ সালে ৪০ বার ভূমিকম্প হয়েছে। ২০০৯ সালের আগস্টে পাঁচবার ও সেপ্টেম্বরে তিনবার ভূমিকম্প হয়। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ভূমিকম্প হয় দুইবার। ২০২০ সালে এখানে ৭৪ বার ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ৩ থেকে ৪ মাত্রার কম্পন ৩৫ বার, ৪ থেকে ৫ মাত্রার কম্পন ৩৩ বার আর ৫ থেকে ৬ মাত্রার কম্পন হয়েছে ৬ বার।
২০২১ সালের ৬ এপ্রিল রংপুরসহ আশেপাশের কয়েকটি জেলায় মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। রাত ৯টা ২০ মিনিটে তিন সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ১, উৎপত্তিস্থল ভুটানের ছ্যামছি এলাকা। ২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রংপুরের বদরগঞ্জ ২ দশমিক ৯ এবং কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে ২. ৪ মাত্রার ভূমিকম্পন হয়।
এদিকে, এই রংপুরসহ এই অঞ্চলকে ভূমিকম্পের রেড জোন হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এত বছরেও এ অঞ্চলকে ভূমিকম্প থেকে সুরক্ষিত করতে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। বরং রংপুর নগরীতে বিল্ডিং কোড না মেনে অবাধে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। সরকারি নানা পরিত্যক্ত ভবনে এখনও চলছে কার্যক্রম।























