জনগণের টাকায় সচিবদের গাড়ি বিলাস?
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৫৯:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ ৬১ বার পড়া হয়েছে
সুদমুক্ত ঋণে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সুবিধা নেওয়ার পরও সরকারি গাড়ি ব্যবহারে লাগাম টানতে পারেননি দেশের শীর্ষ আমলারা। নিয়ম অনুযায়ী ঋণ সুবিধা গ্রহণের পর সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও বাস্তবে অনেক সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একাধিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। ফলে সরকারের পরিবহন খাতে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০১৪ সালে যুগ্ম সচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ চালু করা হয়। তখন যুক্তি ছিল, এতে সরকারি গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং রাষ্ট্রের ব্যয় সাশ্রয় হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। ঋণের টাকায় কেনা ব্যক্তিগত গাড়ি থাকার পরও অনেক কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সংস্থা ও প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন।
নীতিমালার ১৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা গ্রহণকারী কোনো কর্মকর্তা সরকারি বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দপ্তরের রিকুইজিশনকৃত গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন না। কিন্তু এই বিধান কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ২০০ কর্মকর্তা সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কিনেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ একই সঙ্গে সরকারি গাড়িও ব্যবহার করছেন। এতে চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ সরকারের মাসিক অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা, যা বছরে ২৫২ কোটিরও বেশি।
তথ্য অনুযায়ী, অর্থ বিভাগের সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার নিজে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জিপ ব্যবহার করছেন। একই সময়ে তার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য রয়েছে অন্য একটি সরকারি গাড়ি। তার ব্যক্তিগত সহকারীও (পিএস) মন্ত্রণালয়ের গাড়ি ও সরকারি চালক ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে খাদ্য সচিব মাসুদুল হাসানের বিরুদ্ধেও। তিনি মন্ত্রণালয়ের একটি জিপ ব্যবহার করছেন, অন্যদিকে তার পরিবারের সদস্যরা খাদ্য অধিদপ্তরের গাড়ি ব্যবহার করছেন। সচিবের পিএসের জন্যও রয়েছে আলাদা সরকারি গাড়ি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব গাড়ির জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করছে খাদ্য অধিদপ্তর।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের অর্থায়নে পরিচালিত রোহিঙ্গা প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে তার পিএসও অধিদপ্তরের একটি গাড়ি ব্যবহার করছেন।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মুশফিকুর রহমান টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের জিপ ব্যবহার করছেন। তার পিএস ব্যবহার করছেন বিটিসিএলের একটি গাড়ি। অন্যদিকে রেলপথ সচিব ফাহিমুল ইসলাম একটি প্রকল্পের জিপ ব্যবহার করছেন। তার দপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তারাও বিভিন্ন প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন বলে জানা গেছে।
শুধু সচিবরাই নন, অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী রেজা, জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম মঈন উদ্দীন আহম্মেদ এবং ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী নিজ নিজ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহার করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ওবায়দুর রহমান পরিবহন পুলের গাড়ি ও চালক ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পরিবহন পুলের একাধিক গাড়ি বর্তমানে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উচ্চপদস্থ আমলাদের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদের ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়িকে ঘিরে। তিনি প্রায় ৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা মূল্যের একটি ল্যান্ড ক্রুজার ভিএক্স-ভিএইট ব্যবহার করছেন। একই ধরনের আরেকটি বিলাসবহুল জিপ ব্যবহার করছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোখলেস উর রহমান।
সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর বলেন, সচিবরা পরিবহন পুলের গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পান না। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, অনেক সচিব শুধু নিজেরাই নন, তাঁদের পরিবারের সদস্য, ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রকল্পভিত্তিক গাড়িও নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কাজে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিকবার সতর্কবার্তা দিলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হলেও অনিয়ম বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া গাড়ি ঋণ সুবিধা এখন উল্টো বাড়তি আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কর্মকর্তারা সুদমুক্ত ঋণে ব্যক্তিগত গাড়ি কিনছেন, অন্যদিকে সরকারি বহরও বাড়ছে। ফলে জনগণের করের অর্থে পরিবহন ব্যয় ক্রমেই ফুলে-ফেঁপে উঠছে।
এ বিষয়ে খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, দীর্ঘদিনের এই অনিয়ম একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি যানবাহন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
























