ঢাকা ০১:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

অ্যাম্বুলেন্স ‘সিন্ডিকেট’, মরদেহ তোলার পর ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৪৬:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ ৪৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সেবায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সমন্বয়হীনতা এবং “সিন্ডিকেট” নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও এমন অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে রোগী বা মরদেহ তোলার পর ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার দাবি করেছেন স্বজনরা।

সরকারি ও বড় হাসপাতালগুলোর আশপাশে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় থাকে, যারা নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সকে রোগী বহনে বাধা দেয় বা অতিরিক্ত কমিশন আদায় করে। এর ফলে জরুরি পরিস্থিতিতেও রোগী ও স্বজনদের বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হতে হয়।

দরিদ্র এক লোক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর তাঁর মরদেহ বাড়ি ফটিকছড়িতে নিতে স্বজনদের প্রয়োজন হয়েছিল একটি অ্যাম্বুলেন্স। সাধারণ সময়ে যে পথে তিন হাজার টাকার আশপাশে ভাড়া হওয়ার কথা, সেখানে তাঁদের কাছ থেকে দাবি করা হয় আট হাজার টাকা। দর-কষাকষির পরও ভাড়া নামেনি সাড়ে সাত হাজার টাকার নিচে। বাইরে কম টাকায় অ্যাম্বুলেন্স মিললেও ‘সিন্ডিকেটের’ ভয়ে কেউ হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত ধারদেনা করে মরদেহ বাড়ি নিতে হয় পরিবারটিকে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অ্যাম্বুলেন্স ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে দীর্ঘদিনের এমন অভিযোগের মধ্যেই এবার চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া একলাফে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহলে। কেউ কেউ আরও সরাসরি অভিযোগের তীর ছুঁড়ে বলছেন, ‘চট্টগ্রাম মেয়র সিন্ডিকেট না ভেঙে উল্টো সিন্ডিকেটের পক্ষ হয়ে ভাড়া ৩০ পার্সেন্ট বাড়িয়ে ভাড়া নির্ধারণ করলেন।’ বাস্তবে রোগীর স্বজনদের দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়ায় সমিতির অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে বাধ্য করা হয়ে থাকে। অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ তোলার পরপরই ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বর্তমান অবস্থায় এই পরিমাণ আরও বাড়বে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির মধ্যে বাড়তি ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে হাতাহাতির ঘটনার একদিন পর সোমবার (৮ জুন) চট্টগ্রাম মেডিকেলের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় নতুন ভাড়ার তালিকা অনুমোদন করা হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

cc
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সভায় অ্যাম্বুলেন্সের নতুন ভাড়ার তালিকা অনুমোদন করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের সুরাহা না করেই ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও গ্যাসচালিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া কেন একই হারে বাড়ানো হলো। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, সিন্ডিকেট ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার বদলে বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।

হঠাৎ বেড়ে গেল ৩০% বেশি ভাড়া

সোমবার (৮ জুন) দুপুরে ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী ও লাশ পরিবহনের নীতিমালায় বর্ণিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া পুনঃমূল্যায়ন পূর্বক যৌক্তিককরণ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির নেতারা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধি এবং বিআরটিএর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় আলোচনা শেষে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে গত ১৮ জুন বিভিন্ন গন্তব্যের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নির্ধারণ করে একটি তালিকা করা হয়েছিল।

সভায় ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এক বছর আগে বিভিন্ন গন্তব্যে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পর তা থেকে সরে গিয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তাঁকে কেউ অবগত করেননি।

মেয়র বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সমিতি ও সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ৩০ শতাংশ ভাড়া বেড়েছে। নতুন তালিকায় সর্বনিম্ন ভাড়া ১ হাজার ১৪৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে লোহাগাড়া উপজেলার জন্য। সেখানে ননএসি বড় অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৫ হাজার ৪০০ টাকা এবং এসি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৫ হাজার ৭৮৫ টাকা। অন্যদিকে উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় ননএসি বড় অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৭৯৭ টাকা এবং এসি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩ হাজার ৯৯২ টাকা।

তিনি বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে মালিক সমিতির কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হবে। হাসপাতাল এলাকায় দৃশ্যমান স্থানে রেট চার্ট টাঙিয়ে দেওয়া হবে এবং কোনো চালক নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অর্থ নিতে পারবেন না। রোগী ও স্বজনদের হয়রানি রোধে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হবে।

বাইরের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বিতর্ক

সভায় চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, তাঁদের প্রস্তাব ছিল আগের ভাড়ার তুলনায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি। আলোচনা শেষে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, সমিতির বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স মেডিকেল এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। তবে কারও নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স থাকলে তাতে রোগী ও মরদেহ পরিবহন করা যাবে।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আমান উল্লাহ চৌধুরী বলেন, সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় ৩০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে। সোমবার থেকেই নতুন ভাড়া কার্যকর হবে। আগামী তিন মাস এই ভাড়া বহাল থাকবে, এরপর আবার পর্যালোচনা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সমিতির বাইরের অ্যাম্বুলেন্স অনেক সময় এসে ভাড়া নিয়ে যায়। এটি বন্ধ করতে হবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, বাইরে থেকে যেসব অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে আসে, তারা ফেরার সময়ও আরেকটি ভাড়া নিয়ে যায়। এটি না করলেও চলে।

অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে সংঘর্ষ

এর আগে রোববার চট্টগ্রাম মেডিকেলের পূর্ব গেট এলাকায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সদস্যদের সঙ্গে এনসিপির নেতা-কর্মীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত তিনজন আহত হন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের কারণে রোগীর স্বজনদের দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়ায় সমিতির অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে বাধ্য করা হচ্ছিল।

সড়কে অ্যাম্বুলেন্স রাখা যাবে না

সভায় ডা. শাহাদাত হোসেন হাসপাতালসংলগ্ন সড়কের অলি খাঁ মসজিদ এলাকা থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত অংশে রাস্তার ওপর কোনো অ্যাম্বুলেন্স না রাখার নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার মুখে পপুলার ডায়াগনস্টিকসংলগ্ন এলাকা এবং জাতিসংঘ পার্কসংলগ্ন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের খালি জমিতে অ্যাম্বুলেন্স রাখতে হবে। রাস্তায় লাইন ধরে কোনো গাড়ি রাখা যাবে না। হাসপাতাল ক্যাম্পাস এবং সামনের সড়কে অ্যাম্বুলেন্স রাখা যাবে না। ভ্রাম্যমাণ দোকানও বসানো যাবে না। অ্যাম্বুলেন্সের নামে যাতে কোনো মাইক্রোবাস চলতে না পারে, সে বিষয়ে বিআরটিএকে নজর দিতে হবে।

তবে নতুন ভাড়া কার্যকরের ঘোষণার পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, বাইরের অ্যাম্বুলেন্সের প্রবেশে বাধা এবং কথিত ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে। কারণ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকলেও বাস্তবে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে কয়েক গুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে স্বজনদের। ৩০ ভাগ বেশি ভাড়া নির্ধারণ করায় এখন সেটা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

এনসিপির চট্টগ্রাম নগর কমিটির সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘মেয়র সিন্ডিকেট ভাঙলেন না। উল্টো সিন্ডিকেটের পক্ষ হয়ে ভাড়া ৩০ পার্সেন্ট বাড়িয়ে ভাড়া নির্ধারণ করলেন। চলছে জনগণের পকেটমারা কর্মসূচি। দেশে বেড়েছে তেলের দাম, কিন্তু মেয়র গ্যাসচালিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বাড়ালেন ৩০ শতাংশ। ৮০ শতাংশ এম্বুল্যান্সের লাইসেন্স নাই, ১০ বছর ধরে রিনিউ করা নাই, বিশাল অংকের রাজস্ব ফাঁকি। মাইক্রোবাসকে মডিফাই করে লাল-নীল বাতি জ্বালিয়ে হয়ে গেছে অ্যাম্বুলেন্স। মরার পরও নিস্তার নাই।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

অ্যাম্বুলেন্স ‘সিন্ডিকেট’, মরদেহ তোলার পর ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৪৬:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সেবায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সমন্বয়হীনতা এবং “সিন্ডিকেট” নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও এমন অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে রোগী বা মরদেহ তোলার পর ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার দাবি করেছেন স্বজনরা।

সরকারি ও বড় হাসপাতালগুলোর আশপাশে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় থাকে, যারা নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সকে রোগী বহনে বাধা দেয় বা অতিরিক্ত কমিশন আদায় করে। এর ফলে জরুরি পরিস্থিতিতেও রোগী ও স্বজনদের বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য হতে হয়।

দরিদ্র এক লোক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর তাঁর মরদেহ বাড়ি ফটিকছড়িতে নিতে স্বজনদের প্রয়োজন হয়েছিল একটি অ্যাম্বুলেন্স। সাধারণ সময়ে যে পথে তিন হাজার টাকার আশপাশে ভাড়া হওয়ার কথা, সেখানে তাঁদের কাছ থেকে দাবি করা হয় আট হাজার টাকা। দর-কষাকষির পরও ভাড়া নামেনি সাড়ে সাত হাজার টাকার নিচে। বাইরে কম টাকায় অ্যাম্বুলেন্স মিললেও ‘সিন্ডিকেটের’ ভয়ে কেউ হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত ধারদেনা করে মরদেহ বাড়ি নিতে হয় পরিবারটিকে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অ্যাম্বুলেন্স ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে দীর্ঘদিনের এমন অভিযোগের মধ্যেই এবার চট্টগ্রাম মেডিকেল থেকে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া একলাফে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহলে। কেউ কেউ আরও সরাসরি অভিযোগের তীর ছুঁড়ে বলছেন, ‘চট্টগ্রাম মেয়র সিন্ডিকেট না ভেঙে উল্টো সিন্ডিকেটের পক্ষ হয়ে ভাড়া ৩০ পার্সেন্ট বাড়িয়ে ভাড়া নির্ধারণ করলেন।’ বাস্তবে রোগীর স্বজনদের দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়ায় সমিতির অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে বাধ্য করা হয়ে থাকে। অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ তোলার পরপরই ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বর্তমান অবস্থায় এই পরিমাণ আরও বাড়বে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির মধ্যে বাড়তি ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে হাতাহাতির ঘটনার একদিন পর সোমবার (৮ জুন) চট্টগ্রাম মেডিকেলের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় নতুন ভাড়ার তালিকা অনুমোদন করা হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

cc
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সভায় অ্যাম্বুলেন্সের নতুন ভাড়ার তালিকা অনুমোদন করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের সুরাহা না করেই ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও গ্যাসচালিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া কেন একই হারে বাড়ানো হলো। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, সিন্ডিকেট ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার বদলে বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।

হঠাৎ বেড়ে গেল ৩০% বেশি ভাড়া

সোমবার (৮ জুন) দুপুরে ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী ও লাশ পরিবহনের নীতিমালায় বর্ণিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া পুনঃমূল্যায়ন পূর্বক যৌক্তিককরণ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির নেতারা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধি এবং বিআরটিএর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় আলোচনা শেষে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে গত ১৮ জুন বিভিন্ন গন্তব্যের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নির্ধারণ করে একটি তালিকা করা হয়েছিল।

সভায় ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এক বছর আগে বিভিন্ন গন্তব্যে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পর তা থেকে সরে গিয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তাঁকে কেউ অবগত করেননি।

মেয়র বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সমিতি ও সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ৩০ শতাংশ ভাড়া বেড়েছে। নতুন তালিকায় সর্বনিম্ন ভাড়া ১ হাজার ১৪৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে লোহাগাড়া উপজেলার জন্য। সেখানে ননএসি বড় অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৫ হাজার ৪০০ টাকা এবং এসি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৫ হাজার ৭৮৫ টাকা। অন্যদিকে উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় ননএসি বড় অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৭৯৭ টাকা এবং এসি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৩ হাজার ৯৯২ টাকা।

তিনি বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে মালিক সমিতির কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হবে। হাসপাতাল এলাকায় দৃশ্যমান স্থানে রেট চার্ট টাঙিয়ে দেওয়া হবে এবং কোনো চালক নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অর্থ নিতে পারবেন না। রোগী ও স্বজনদের হয়রানি রোধে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হবে।

বাইরের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বিতর্ক

সভায় চট্টগ্রাম অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, তাঁদের প্রস্তাব ছিল আগের ভাড়ার তুলনায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি। আলোচনা শেষে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, সমিতির বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স মেডিকেল এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে না। তবে কারও নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স থাকলে তাতে রোগী ও মরদেহ পরিবহন করা যাবে।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আমান উল্লাহ চৌধুরী বলেন, সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় ৩০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে। সোমবার থেকেই নতুন ভাড়া কার্যকর হবে। আগামী তিন মাস এই ভাড়া বহাল থাকবে, এরপর আবার পর্যালোচনা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সমিতির বাইরের অ্যাম্বুলেন্স অনেক সময় এসে ভাড়া নিয়ে যায়। এটি বন্ধ করতে হবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, বাইরে থেকে যেসব অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে আসে, তারা ফেরার সময়ও আরেকটি ভাড়া নিয়ে যায়। এটি না করলেও চলে।

অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে সংঘর্ষ

এর আগে রোববার চট্টগ্রাম মেডিকেলের পূর্ব গেট এলাকায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সদস্যদের সঙ্গে এনসিপির নেতা-কর্মীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত তিনজন আহত হন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের কারণে রোগীর স্বজনদের দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়ায় সমিতির অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিতে বাধ্য করা হচ্ছিল।

সড়কে অ্যাম্বুলেন্স রাখা যাবে না

সভায় ডা. শাহাদাত হোসেন হাসপাতালসংলগ্ন সড়কের অলি খাঁ মসজিদ এলাকা থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত অংশে রাস্তার ওপর কোনো অ্যাম্বুলেন্স না রাখার নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার মুখে পপুলার ডায়াগনস্টিকসংলগ্ন এলাকা এবং জাতিসংঘ পার্কসংলগ্ন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের খালি জমিতে অ্যাম্বুলেন্স রাখতে হবে। রাস্তায় লাইন ধরে কোনো গাড়ি রাখা যাবে না। হাসপাতাল ক্যাম্পাস এবং সামনের সড়কে অ্যাম্বুলেন্স রাখা যাবে না। ভ্রাম্যমাণ দোকানও বসানো যাবে না। অ্যাম্বুলেন্সের নামে যাতে কোনো মাইক্রোবাস চলতে না পারে, সে বিষয়ে বিআরটিএকে নজর দিতে হবে।

তবে নতুন ভাড়া কার্যকরের ঘোষণার পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, বাইরের অ্যাম্বুলেন্সের প্রবেশে বাধা এবং কথিত ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে। কারণ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকলেও বাস্তবে রোগী ও মরদেহ পরিবহনে কয়েক গুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে স্বজনদের। ৩০ ভাগ বেশি ভাড়া নির্ধারণ করায় এখন সেটা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

এনসিপির চট্টগ্রাম নগর কমিটির সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘মেয়র সিন্ডিকেট ভাঙলেন না। উল্টো সিন্ডিকেটের পক্ষ হয়ে ভাড়া ৩০ পার্সেন্ট বাড়িয়ে ভাড়া নির্ধারণ করলেন। চলছে জনগণের পকেটমারা কর্মসূচি। দেশে বেড়েছে তেলের দাম, কিন্তু মেয়র গ্যাসচালিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বাড়ালেন ৩০ শতাংশ। ৮০ শতাংশ এম্বুল্যান্সের লাইসেন্স নাই, ১০ বছর ধরে রিনিউ করা নাই, বিশাল অংকের রাজস্ব ফাঁকি। মাইক্রোবাসকে মডিফাই করে লাল-নীল বাতি জ্বালিয়ে হয়ে গেছে অ্যাম্বুলেন্স। মরার পরও নিস্তার নাই।’