ইউনূস সরকারের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিতর্ক, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:১৯:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তি নিয়ে বিতর্ক এখনও চলছে। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে চুক্তিটি সই হওয়ায় এর সময় ও শর্ত—দুই নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চিঠিতে লিখেছেন, পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের কৃষক ও শ্রমিকরা উপকৃত হবেন। তবে দেশে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, চুক্তির শর্তে বাংলাদেশের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষিত হয়নি।
শুল্ক কমেছে, কিন্তু কী শর্তে?
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন এক নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশসহ বহু দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা প্রথমে ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে এবং সর্বশেষ চুক্তির পর ১৯ শতাংশে নেমে আসে।
নয় মাসের আলোচনার পর চুক্তি হলেও, সমালোচকদের মতে—বাংলাদেশ শুল্ক কমানোর বিনিময়ে বেশ কিছু বড় অঙ্গীকার করেছে।
কী কী কিনতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ?
চুক্তির ‘কমার্শিয়াল কনসিডারেশন’ অংশে উল্লেখ আছে—১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা, ১৫ বছরে ১,৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি, বছরে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য ক্রয়।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—এসব কেনাকাটা বাস্তব চাহিদা বিবেচনায়, নাকি বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চাপ সামলাতে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান মনে করেন, তৈরি পোশাক খাতের বাজার ধরে রাখাই ছিল বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। তবে তাঁর মতে, সরকার অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে রাজনৈতিক সমর্থনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
সমালোচনার মূল পয়েন্টগুলো
সিপিডির বিশ্লেষকদের মতে চুক্তিতে কয়েকটি ঝুঁকির জায়গা রয়েছে—
১. বাধ্যতামূলক ক্রয়সংক্রান্ত অঙ্গীকার
নির্দিষ্ট অঙ্ক ও সংখ্যা উল্লেখ থাকায় ভবিষ্যতে প্রয়োজন না থাকলেও ক্রয় স্থগিত করা কঠিন হতে পারে।
২. বেসরকারি খাতের চাপ
কৃষিপণ্য, তুলা বা ভোজ্যতেল আমদানি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করবে। কিন্তু তারা যদি ভারত বা চীন থেকে কম দামে পায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে কেনার চাপ পড়তে পারে।
৩. প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত ধারা
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর ইঙ্গিত আছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী দেশ থেকে কিছু ক্রয় সীমিত রাখার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে।
৪. পারমাণবিক জ্বালানি সংক্রান্ত ধারা
যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সংঘাত রয়েছে এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা জ্বালানি কেনায় বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। যদিও বিদ্যমান প্রকল্পের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে—যা রূপপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।
৫. বাজারমূল্য ও ভর্তুকি ইস্যু
চুক্তিতে বলা হয়েছে, তৃতীয় দেশের কোম্পানি বাজারমূল্যের নিচে পণ্য বিক্রি করলে তা সীমিত করা হতে পারে—যা ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজস্ব ও নীতি-স্বাধীনতার প্রশ্ন
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি এবং বাংলাদেশের ১,৬৩৮টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এতে রাজস্ব কমার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া মান নিয়ন্ত্রণ, মেধাস্বত্ব ও কারিগরি মানদণ্ডের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকায় ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
ইউনূসের যুক্তি কী ছিল?
দায়িত্ব ছাড়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শূন্য শুল্ক সুবিধা বড় অর্জন।
তাঁর মতে, এটি কেবল বাণিজ্য নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
তাহলে বিতর্ক কেন থামছে না?
বিতর্কের মূল কারণ তিনটি— সময়ের প্রশ্ন: নির্বাচনের আগে কেন সই? স্বচ্ছতার প্রশ্ন: নয় মাস আলোচনার পরও আগে কেন বিস্তারিত জানানো হয়নি? ভারসাম্যের প্রশ্ন: শুল্ক কমানোর বিনিময়ে ছাড় কি বেশি দেওয়া হয়েছে?
এখন কী করবে নতুন সরকার?
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি। তবে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন এমন একজন উপদেষ্টা নতুন সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন—এতে চুক্তি পুরোপুরি বাতিল করা কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফলে প্রশ্ন রয়ে গেছে—নতুন সরকার কি চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করবে, নাকি বাস্তবায়নেই এগোবে?
এই চুক্তি এখন কেবল বাণিজ্য নয়—অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও নীতি-স্বাধীনতার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।























