উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব কোথায়? প্রতিশ্রুতি, নীতিমালা ও বাস্তবতার ফাঁক
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৭:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণেই প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দিয়েছিলেন—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে এবং সরকারের সব উপদেষ্টা দ্রুত তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন।
সেই ঘোষণার প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও উপদেষ্টাদের কারও সম্পদের হিসাব আজও জনসম্মুখে আসেনি। সরকার বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ালেও এই মৌলিক জবাবদিহিতার প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান
দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অরাজনৈতিক সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নতুন নজির স্থাপন করবে—এমন বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশা ক্রমেই হতাশায় রূপ নিয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করছে, প্রতিশ্রুতি দিয়েও সম্পদের তথ্য প্রকাশ না করা খুবই হতাশাজনক। তাদের মতে, যারা জবাবদিহিতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের কথা বলেছিলেন, তাদের কাছ থেকে এমন অস্বচ্ছতা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না।
নীতিমালা থাকলেও প্রয়োগ নেই
২০২৪ সালের ১ অক্টোবর ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে—উপদেষ্টাদের প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সম্পদের বিবরণী দিতে হবে এবং প্রধান উপদেষ্টা সেগুলো প্রকাশ করবেন।
কিন্তু বাস্তবে এই নীতিমালা কার্যকর হওয়ার কোনো দৃশ্যমান নজির নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল কাগুজে ঘোষণা ছিল?
সন্দেহ ও সমালোচনার জায়গা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হওয়ায় উপদেষ্টাদের নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। কেউ কেউ ধারণা করছেন, সম্পদের তথ্য প্রকাশ করলে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কাই হয়তো তাদের পিছিয়ে রাখছে।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, এই ব্যর্থতা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে, যেখানে মন্ত্রী-আমলারা সম্পদের হিসাব না দেওয়ার ‘উছিলা’ পেয়ে যাবে।
দুর্নীতির অভিযোগ ও আস্থার সংকট
সরকার গঠনের এক বছরের মধ্যেই একাধিক উপদেষ্টা, তাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। যদিও সরকার এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলেছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত বা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপদেষ্টাদের অধীনস্থ কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়ালে সেই দায় কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার ওপরও এসে পড়ে। অথচ এ বিষয়ে স্পষ্ট জবাবদিহি বা আত্মসমালোচনার নজির খুব কমই দেখা গেছে।
স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও গ্রামীণ প্রশ্ন
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়াও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কর অব্যাহতি, অংশীদারিত্ব কমানো, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে কি না—সে প্রশ্নের পরিষ্কার ব্যাখ্যা এখনো আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতায় থাকাটাই প্রভাব বিস্তারের জন্য যথেষ্ট, তাই এসব সিদ্ধান্ত আরও বেশি স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা জরুরি ছিল।
এখনো কি সুযোগ আছে?
অনেক বিশ্লেষকের মতে, পুরোপুরি সময় শেষ হয়ে যায়নি। বিদায়ের আগে যদি উপদেষ্টারা দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার সম্পদ ও দায়িত্ব ছাড়ার সময়কার সম্পদের তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করেন, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।
সারকথা, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না হওয়া সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এখন শেষ সময়ে এসে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া শুধু জনস্বার্থেই নয়, বরং সরকারের নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।























