ঢাকা ০৫:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জোট ভাঙা, ব্যথা ও প্রত্যয়—মান্নার নতুন লড়াই

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬ ৪৫ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঢাকার এক শীতল রাত। হাতে হাসপাতালের রিপোর্ট, বুকে ব্যথা—তবু মুখে শান্ত দৃঢ়তা। হাসপাতালে শুয়ে থাকা মানুষটি মাহমুদুর রহমান মান্না। গত শুক্রবার রাতে আকস্মিক বুকে ব্যথা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। এনজিওগ্রাম শেষে চিকিৎসকরা সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিলেও, তাঁর মাথায় তখন অন্য ব্যথা—রাজনীতির ব্যথা।

এক যুগের রাজনৈতিক সঙ্গী বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্তটা কীভাবে এল—এ প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেও পুরোটা ব্যাখ্যা করতে পারেন না। তবুও বললেন, “বগুড়া-২ আসনে আমাকে সমর্থন দিল, আবার নিজেরাও প্রার্থী দিল। কেন করল, জানি না।” কথাগুলো বলার সময় তাঁর চোখে ছিল ক্ষোভ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অচেনা হতাশা।

এক দশকের সখ্যতার শেষ মুহূর্ত

২০১৩ সাল থেকে যে পথচলা শুরু—আন্দোলন, জোট, বন্ধুত্ব, জেল, ব্যারিকেড—শেষমেশ এসে থামল ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। একসময় বিএনপির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাগরিক ঐক্য আজ একা। বস্তুত “বদলে দাও বাংলাদেশ” স্লোগান নিয়ে তারা এগোচ্ছে ১১টি আসনে নিজেদের প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে।

পথ আলাদা হয়ে গেছে—কিন্তু সম্পর্ক পুরোপুরি কি শেষ? মির্জা ফখরুল হাসপাতালে গিয়ে মান্নার খোঁজ নিলেন। রাজনৈতিক ভাষার বাইরে সেই সাক্ষাৎ ছিল নিঃশব্দ মানবিক স্পর্শ।

রাজনীতির মঞ্চে মানুষটি

বাড়ি ফেরার পর মঙ্গলবার রাতে তিনি আবার মঞ্চে। উত্তরার মুগ্ধ মঞ্চে জনতার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “রাজনীতি করব। নির্বাচন ছাড়ব না। মন্ত্রী হলে পরে হব, না হলে না হব—কিন্তু নির্বাচন ছাড়ব না।”

এই কথাগুলোর মধ্যে ছিল একটা মানুষের আত্মসম্মান—যে মানুষটি ‘অফার’ পেয়েও থামেনি। “আপনাকে মন্ত্রী বানানো হবে”—এ রকম প্রলোভন নিয়ে অনেকে এসেছিল। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, তা হলে রাজনীতি হবে ভিক্ষা, হবে সদকার মতো। মানুষটি ভিক্ষা চায় না—চায় নিজের লড়াইয়ের অধিকার।

দলের নয়জন সঙ্গী—একটি নতুন যাত্রা

মান্নার পাশে থাকছেন আরও নয়জন প্রার্থী—যাঁরা রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব না কষে সিদ্ধান্তে সঙ্গ দিয়েছেন। রংপুরের মোফাখখারুল ইসলাম থেকে চট্টগ্রামের স্বপন মজুমদার—প্রতিটি নামের পেছনে আছে অজানা সংগ্রাম, পরিবার, আশা আর অনিশ্চয়তা।

বিচ্ছেদ, কিন্তু বিদায় নয়

রাজনীতির ইতিহাসে জোট ভাঙা কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিটি বিচ্ছেদের পেছনে থাকে মানুষ—তার সম্পর্ক, তার আশা, তার আঘাত।

এই বিচ্ছেদেও তাই আছে: থামা বন্ধুত্ব, অসমাপ্ত প্রত্যাশা, অভিভাবকহীন হতাশা, একা দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত।

নাগরিক ঐক্য হয়তো বড় দল নয়, কিন্তু মানুষের সিদ্ধান্ত কখনো সংখ্যায় মাপা যায় না। মান্না আজ হাসপাতালের বেড ছেড়ে মঞ্চে দাঁড়ান। চিকিৎসকের সাবধানতা সত্ত্বেও তাঁর যাত্রা থামে না—কারণ তাঁর কাছে রাজনীতি মানে মন্ত্রণালয় নয়, লড়াই।

এ গল্প আসলে রাজনীতির নয়—এক মানুষের নীরব প্রতিজ্ঞার গল্প। যিনি সবশেষে বলেছেন— “নির্বাচন ছাড়ব না।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

জোট ভাঙা, ব্যথা ও প্রত্যয়—মান্নার নতুন লড়াই

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকার এক শীতল রাত। হাতে হাসপাতালের রিপোর্ট, বুকে ব্যথা—তবু মুখে শান্ত দৃঢ়তা। হাসপাতালে শুয়ে থাকা মানুষটি মাহমুদুর রহমান মান্না। গত শুক্রবার রাতে আকস্মিক বুকে ব্যথা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। এনজিওগ্রাম শেষে চিকিৎসকরা সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিলেও, তাঁর মাথায় তখন অন্য ব্যথা—রাজনীতির ব্যথা।

এক যুগের রাজনৈতিক সঙ্গী বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্তটা কীভাবে এল—এ প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেও পুরোটা ব্যাখ্যা করতে পারেন না। তবুও বললেন, “বগুড়া-২ আসনে আমাকে সমর্থন দিল, আবার নিজেরাও প্রার্থী দিল। কেন করল, জানি না।” কথাগুলো বলার সময় তাঁর চোখে ছিল ক্ষোভ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অচেনা হতাশা।

এক দশকের সখ্যতার শেষ মুহূর্ত

২০১৩ সাল থেকে যে পথচলা শুরু—আন্দোলন, জোট, বন্ধুত্ব, জেল, ব্যারিকেড—শেষমেশ এসে থামল ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। একসময় বিএনপির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাগরিক ঐক্য আজ একা। বস্তুত “বদলে দাও বাংলাদেশ” স্লোগান নিয়ে তারা এগোচ্ছে ১১টি আসনে নিজেদের প্রতীক ‘কেটলি’ নিয়ে।

পথ আলাদা হয়ে গেছে—কিন্তু সম্পর্ক পুরোপুরি কি শেষ? মির্জা ফখরুল হাসপাতালে গিয়ে মান্নার খোঁজ নিলেন। রাজনৈতিক ভাষার বাইরে সেই সাক্ষাৎ ছিল নিঃশব্দ মানবিক স্পর্শ।

রাজনীতির মঞ্চে মানুষটি

বাড়ি ফেরার পর মঙ্গলবার রাতে তিনি আবার মঞ্চে। উত্তরার মুগ্ধ মঞ্চে জনতার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “রাজনীতি করব। নির্বাচন ছাড়ব না। মন্ত্রী হলে পরে হব, না হলে না হব—কিন্তু নির্বাচন ছাড়ব না।”

এই কথাগুলোর মধ্যে ছিল একটা মানুষের আত্মসম্মান—যে মানুষটি ‘অফার’ পেয়েও থামেনি। “আপনাকে মন্ত্রী বানানো হবে”—এ রকম প্রলোভন নিয়ে অনেকে এসেছিল। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, তা হলে রাজনীতি হবে ভিক্ষা, হবে সদকার মতো। মানুষটি ভিক্ষা চায় না—চায় নিজের লড়াইয়ের অধিকার।

দলের নয়জন সঙ্গী—একটি নতুন যাত্রা

মান্নার পাশে থাকছেন আরও নয়জন প্রার্থী—যাঁরা রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব না কষে সিদ্ধান্তে সঙ্গ দিয়েছেন। রংপুরের মোফাখখারুল ইসলাম থেকে চট্টগ্রামের স্বপন মজুমদার—প্রতিটি নামের পেছনে আছে অজানা সংগ্রাম, পরিবার, আশা আর অনিশ্চয়তা।

বিচ্ছেদ, কিন্তু বিদায় নয়

রাজনীতির ইতিহাসে জোট ভাঙা কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিটি বিচ্ছেদের পেছনে থাকে মানুষ—তার সম্পর্ক, তার আশা, তার আঘাত।

এই বিচ্ছেদেও তাই আছে: থামা বন্ধুত্ব, অসমাপ্ত প্রত্যাশা, অভিভাবকহীন হতাশা, একা দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত।

নাগরিক ঐক্য হয়তো বড় দল নয়, কিন্তু মানুষের সিদ্ধান্ত কখনো সংখ্যায় মাপা যায় না। মান্না আজ হাসপাতালের বেড ছেড়ে মঞ্চে দাঁড়ান। চিকিৎসকের সাবধানতা সত্ত্বেও তাঁর যাত্রা থামে না—কারণ তাঁর কাছে রাজনীতি মানে মন্ত্রণালয় নয়, লড়াই।

এ গল্প আসলে রাজনীতির নয়—এক মানুষের নীরব প্রতিজ্ঞার গল্প। যিনি সবশেষে বলেছেন— “নির্বাচন ছাড়ব না।”