বড় সাজ্জাদের ছায়া সাম্রাজ্যের রক্তাক্ত অধ্যায়
ঝুট ব্যবসা: স্বর্ণখনির মতো এক কালো অর্থনীতি
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬ ৪৫ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রামের ঝুট কাপড়ের বাজারটি সাধারণ চোখে হয়তো কেবলই ব্যবসার ক্ষেত্র—তবে এর অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে ক্ষমতা, অর্থ ও বলয়ের জটিল অঙ্ক। সেই অঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক অদৃশ্য চরিত্র—সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিদেশের মাটিতে পলাতক থেকেও যার হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে ফটিকছড়ির ঝুট বাণিজ্যের ভাগ্য, আর সেই সাথে ধরা পড়েছে বহু জীবনের সমাপ্তি।
তার সাম্রাজ্য দৃশ্যমান নয়—তবে এর অস্তিত্ব অনুভব করা যায় গুলির শব্দে, ব্যবসায়ীদের নিখোঁজ হয়, মামলায়, রক্তাক্ত দেহে। আর সেই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সাম্প্রতিক অধ্যায় হল জামাল উদ্দিন হত্যাকাণ্ড, যা শুধু একটি খুন নয়—বরং বড় সাজ্জাদের নেটওয়ার্কের অন্তর্গত ক্ষমতার রক্তাক্ত প্রদর্শন।
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বিদেশে পলাতক থাকা সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা বড় সাজ্জাদ এলাকার অপরাধ জগতের অন্যতম শীর্ষ নাম হিসেবে পরিচিত।
গ্রেপ্তার নাজিমের স্বীকারোক্তিতে নতুন মোড়
গত মঙ্গলবার রাতে কোতোয়ালী থানার লালদীঘি পাড় এলাকা থেকে নাজিম উদ্দিন ওরফে বাইট্ট্যা নাজিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ দল। পরদিন বুধবার (১৪ জানুয়ারি) আদালতে হাজির করলে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন।
স্বীকারোক্তিতে তিনি জানান, ঝুট কাপড় ব্যবসার নিয়মিত কার্যক্রম ও টেন্ডার সুযোগগুলো নিয়ন্ত্রণ করছিল বড় সাজ্জাদের সংগঠিত গ্রুপ। কিন্তু গত বছর একটি পোশাক কারখানার ঝুট কাপড়ের টেন্ডার পাওয়াকে কেন্দ্র করে জামাল উদ্দিনের সঙ্গে বড় সাজ্জাদের বিরোধ তৈরি হয়। টেন্ডারটি জামাল পেয়ে যাওয়ায় বড় সাজ্জাদ রুষ্ট হন এবং সেই থেকে দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। পরবর্তীতে জামালকে নির্মূল করতে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাজিমকে নিজেদের দলে ভেড়ায় অপরাধ চক্র।
মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় গুলি, নাছির আহত
১০ জানুয়ারি (শনিবার) রাত ৯টার দিকে ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর দীঘিরপাড় এলাকায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় জামাল উদ্দিনের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। এসময় তার সঙ্গে থাকা নাছির উদ্দিন (৪২) গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।
পুলিশ জানায়, নাজিমই জামালের প্রতিটি গতিবিধির তথ্য ঘাতকদের কাছে পাঠাতেন এবং ঘটনার রাতে তিনি তিনজন সশস্ত্র হামলাকারীকে পথ দেখিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যান। সেখানেই এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে জামালকে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ১১টি পিস্তলের খোসা উদ্ধার করে।
মোটরসাইকেল লুকিয়ে ফেলে নাজিম, উদ্ধার করেছে পুলিশ
হামলার পর জামালের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নিয়ে সটকে পড়েন নাজিম। পরে সেটি নিজ এলাকার লেলাং গ্রামের কাবিল মিস্ত্রির বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে পুলিশ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে।
সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ ইমন ও মোবারক সরাসরি জড়িত
বুধবার বিকেলে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন— “বিদেশে অবস্থানরত সাজ্জাদ আলীর নির্দেশনায়ই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। জামালের গতিবিধির তথ্য নাজিম সরবরাহ করেছে এবং ঘটনাস্থলেও উপস্থিত ছিল।”
তিনি আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডে সাজ্জাদের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইমন ও মোবারক সরাসরি অংশ নেয়। নিহত জামালের বিরুদ্ধেও তিনটি হত্যা মামলা ছিল। জামালের একটি ছোট গ্রুপ থাকলেও সাজ্জাদের শক্তিশালী বাহিনীর সঙ্গে টিকতে পারেনি। তবে তদন্ত স্বার্থে সন্দেহভাজনদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
পেছনের প্রেক্ষাপট
তদন্ত সূত্র বলছে— সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ ছাত্রশিবির রাজনীতি থেকে উঠে আসা। প্রায় ২০ বছর বিদেশে পলাতক অবস্থান। চট্টগ্রামের ঝুট কাপড় ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার দখল ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ আছে। এলাকাজুড়ে তার পরিচিতি ছিল ‘শিবির ক্যাডার’ নামে।





















