ঢাকা ০৬:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের পথে এক দশক পর আলো

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৫৪:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রায় এক দশক আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ছুটে এসেছিল লাখো মানুষ। পেছনে রেখে এসেছে পুড়ে যাওয়া ঘর, হারিয়ে যাওয়া স্বজন, আর অকথ্য নির্যাতনের স্মৃতি। আজ সেই মানুষেরা ছাতার পাতার মতো ছড়িয়ে আছে কক্সবাজারের পাহাড়ি ক্যাম্পে—তাঁদের চোখে এখনো একই প্রশ্ন: “আমাদের জীবনের মূল্য কি নেই?”

ঠিক সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে আজ দাঁড়িয়ে গেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ বিচারালয়। সোমবার (১২ জানুয়ারি), নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজি) শুরু হয়েছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগের বিচার। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শুরু হওয়া এই শুনানি চলবে টানা তিন সপ্তাহ। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের গণমাধ্যম।

জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কাঠামো—‘ইউএন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’-এর প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান নিশ্চিত করেছেন, বহু বছরের মামলা আজ আনুষ্ঠানিক বিচারিক পর্বে প্রবেশ করেছে।

রাখাইন থেকে বাংলাদেশ: রক্তমাখা সেই পথ

২০১৭ সালের জুলাই—রাখাইনের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে শুরু হয় তীব্র সামরিক অভিযান। সরকারের দাবি—কিছু পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) হামলা চালায়। কিন্তু প্রতিক্রিয়া হিসেবে যে অভিযান শুরু হয়, সেটি দ্রুতই পরিণত হয় বেসামরিক রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞে—ঘরে আগুন, ধর্ষণ, লুট, গুলি—সব মিলিয়ে সে সময় বিশ্ব দেখেছিল এক নির্মম মানবিক বিপর্যয়।

বাংলাদেশ সরকারের হিসাব বলছে, প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যাদের অধিকাংশ আজও এখানেই।

গণহত্যার মামলা ও আন্তর্জাতিক লড়াই

জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দল সেই ঘটনাগুলো যাচাই করে জানায়—এটি ছিল পরিকল্পিত ও গণহত্যামূলক অভিযান। সেই প্রতিবেদন হাতে নিয়েই ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আইসিজিতে মামলা করে।

সে সময় মিয়ানমারের পক্ষে নিজেই হাজির হয়েছিলেন অং সান সুচি—অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন, বলেছিলেন মামলাটি “তথ্যগতভাবে অসম্পূর্ণ।” কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ভিন্ন চিত্র—তিনি কারাবন্দী, আর তাঁর নিজ দেশেই চলছে তাঁর বিচার।

ন্যায়বিচারের প্রশ্ন: শুধু আইন নয়, এক মানবিক দায়

এই মামলার গুরুত্ব শুধু আইনি নয়। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্তৃপক্ষ বলছে— গণহত্যা কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে, অপরাধের প্রমাণ কীভাবে যাচাই হবে,

আন্তর্জাতিক বিচার কতটা কার্যকর হতে পারে— এসব প্রশ্নের দিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই বিচার শুধু অতীতের রক্তাক্ত গল্প নয়—এটি ভবিষ্যতে এমন অপরাধ ঠেকানোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত।

আইনজীবীদের যুক্তি-তর্কের বাইরে কক্সবাজারের কোনো এক ক্যাম্পে বসে ১২ বছরের এক রোহিঙ্গা কিশোরী আজ কেবল এতটাই বলেছে—“আমি চাই, আমাদের কেউ একদিন বলুক—তোমরা ভুল ছিলে না।” সম্ভবত সেই বাক্যই এই বিচারকে সবচেয়ে বেশি মানবিক ও সবচেয়ে বেশি জরুরি করে তোলে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের পথে এক দশক পর আলো

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৫৪:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

প্রায় এক দশক আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ছুটে এসেছিল লাখো মানুষ। পেছনে রেখে এসেছে পুড়ে যাওয়া ঘর, হারিয়ে যাওয়া স্বজন, আর অকথ্য নির্যাতনের স্মৃতি। আজ সেই মানুষেরা ছাতার পাতার মতো ছড়িয়ে আছে কক্সবাজারের পাহাড়ি ক্যাম্পে—তাঁদের চোখে এখনো একই প্রশ্ন: “আমাদের জীবনের মূল্য কি নেই?”

ঠিক সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে আজ দাঁড়িয়ে গেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ বিচারালয়। সোমবার (১২ জানুয়ারি), নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজি) শুরু হয়েছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগের বিচার। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শুরু হওয়া এই শুনানি চলবে টানা তিন সপ্তাহ। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের গণমাধ্যম।

জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কাঠামো—‘ইউএন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’-এর প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান নিশ্চিত করেছেন, বহু বছরের মামলা আজ আনুষ্ঠানিক বিচারিক পর্বে প্রবেশ করেছে।

রাখাইন থেকে বাংলাদেশ: রক্তমাখা সেই পথ

২০১৭ সালের জুলাই—রাখাইনের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে শুরু হয় তীব্র সামরিক অভিযান। সরকারের দাবি—কিছু পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) হামলা চালায়। কিন্তু প্রতিক্রিয়া হিসেবে যে অভিযান শুরু হয়, সেটি দ্রুতই পরিণত হয় বেসামরিক রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞে—ঘরে আগুন, ধর্ষণ, লুট, গুলি—সব মিলিয়ে সে সময় বিশ্ব দেখেছিল এক নির্মম মানবিক বিপর্যয়।

বাংলাদেশ সরকারের হিসাব বলছে, প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যাদের অধিকাংশ আজও এখানেই।

গণহত্যার মামলা ও আন্তর্জাতিক লড়াই

জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দল সেই ঘটনাগুলো যাচাই করে জানায়—এটি ছিল পরিকল্পিত ও গণহত্যামূলক অভিযান। সেই প্রতিবেদন হাতে নিয়েই ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আইসিজিতে মামলা করে।

সে সময় মিয়ানমারের পক্ষে নিজেই হাজির হয়েছিলেন অং সান সুচি—অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন, বলেছিলেন মামলাটি “তথ্যগতভাবে অসম্পূর্ণ।” কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ভিন্ন চিত্র—তিনি কারাবন্দী, আর তাঁর নিজ দেশেই চলছে তাঁর বিচার।

ন্যায়বিচারের প্রশ্ন: শুধু আইন নয়, এক মানবিক দায়

এই মামলার গুরুত্ব শুধু আইনি নয়। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্তৃপক্ষ বলছে— গণহত্যা কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে, অপরাধের প্রমাণ কীভাবে যাচাই হবে,

আন্তর্জাতিক বিচার কতটা কার্যকর হতে পারে— এসব প্রশ্নের দিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই বিচার শুধু অতীতের রক্তাক্ত গল্প নয়—এটি ভবিষ্যতে এমন অপরাধ ঠেকানোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত।

আইনজীবীদের যুক্তি-তর্কের বাইরে কক্সবাজারের কোনো এক ক্যাম্পে বসে ১২ বছরের এক রোহিঙ্গা কিশোরী আজ কেবল এতটাই বলেছে—“আমি চাই, আমাদের কেউ একদিন বলুক—তোমরা ভুল ছিলে না।” সম্ভবত সেই বাক্যই এই বিচারকে সবচেয়ে বেশি মানবিক ও সবচেয়ে বেশি জরুরি করে তোলে।