ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মায়ের কোল থেকে মৃত্যুর কোলে শিশু সাজিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৪৩:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ৫২ বার পড়া হয়েছে

শিশু সাজিদ

বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাকিব ও তার স্ত্রী তাদের দুই বছরের ছেলেকে নিয়ে মাটিতে গেঁথে যাওয়া ট্রলিকে দেখতে যান। শিশুটি তার মায়ের কোল থেকে নেমে জমির মধ্যে হাঁটছিল। কোনো এক সময় পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের ওই গর্তে পড়ে যায় সে।

পরে স্থানীয়রা ছাড়াও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করতে পারেনি। এরপর ফায়ার সার্ভিসের তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী সদর স্টেশনের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে। তারা শিশু সাজিদকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। শিশুটিকে জীবিত রাখতে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গর্তের পাশে এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি খনন করা হয়।

বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট তিনটি এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি খনন করে। তারা ৪০ ফুট মাটি খনন করেও শিশু সাজিদকে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে রাত ৯টার দিকে শিশুটিকে মাটির নিচ থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার পাচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে সাজিদ গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে নিখোঁজ হয়। এরপর থেকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা শিশু সাজিদকে উদ্ধারে কাজ শুরু করে।

ফায়ার সার্ভিস প্রথম পর্যায়ে চার্জ ভিশন ক্যামেরা দিয়ে প্রায় ৩৫ ফুট পর্যন্ত অনুসন্ধান চালায়। তবে শিশুর অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। এরপর পাশেই এস্কেভেটর দিয়ে রাতভর প্রায় ৩৫ ফুট গভীর বড় একটি গর্ত খনন করা হয়। সকালে সেই গর্ত থেকে নলকূপের দিকে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার চেষ্টা করা হলেও সেখানেও শিশুর অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।

এরপর আবারও পরিত্যক্ত নলকূপে ক্যামেরা নামানো হলে সেটিতে মাটি ছাড়া আর কিছু দেখা যায়নি। এরপর নতুন করে আবারও খননের সিদ্ধান্ত নেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছরখানেক আগে জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ওই নলকূপ খোঁড়া হয়েছিল। পানি না ওঠায় মালিক সেটি মাটি দিয়ে ঢেকে রাখেন। সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে মাটি ধসে পড়ে নলকূপের মুখ আবারও উন্মুক্ত হয়ে যায়। সেই গর্তেই দুর্ঘটনাবশত পড়ে যায় শিশু সাজিদ।

শিশুটির মা রুনা খাতুন জানান, বুধবার দুপুর ১টার দিকে মেজো ছেলে সাজিদের হাত ধরে তিনি বাড়ির পাশের মাঠে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার ছোট একটি সন্তান কোলে ছিল। হাঁটার সময় হঠাৎ সাজিদ ‘মা’ বলে ডেকে ওঠে। পেছনে তাকিয়ে দেখেন, ছেলে নেই, গর্তের ভেতর থেকে ‘মা, মা’ বলে ডাকছে।

গর্তটির ওপরে খড় বিছানো ছিল। ওখানে যে গর্ত ছিল, সেটা বুঝতে পারেননি তিনি নিজে কিংবা শিশু সাজিদ। ওই জায়গায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুটি গর্তের ভেতর পড়ে যায়। লোকজন ডাকাডাকি করতে করতেই গর্তের তলায় চলে যায়।

শিশু সাজিদরা তিন ভাই। বড় ভাই সাদমান স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ভাই সাব্বিরের বয়স মাত্র তিন মাস। বাবা রাকিব গাজীপুরে একটি ঝুট কারখানায় কাজ করেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, তানোরের কোয়েল হাট গ্রামে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এ এলাকায় এখন গভীর নলকূপ বসানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে। এরপরও ওই গ্রামের এক ব্যক্তি তাঁর জমিতে পানির স্তর পাওয়া যায় কি না, সেটা যাচাই করার জন্য গর্তটি খনন করেছিলেন। সেই গর্ত ভরাটও করেছিলেন; কিন্তু বর্ষায় মাটি বসে গিয়ে নতুন করে গর্ত সৃষ্টি হয়। মায়ের সঙ্গে মাঠে গিয়ে শিশুটি সেই গর্তে পড়ে যায়।

সন্তানটিকে একবার দেখা, বুকে জড়িয়ে ধরার আশায় ছিলেন মা। সাজিদের মা রুনা খাতুন দুপুরে ঘরে বসে ছিলেন। বললেন, কছির উদ্দিন তিন জায়গা খুঁড়েছিল…দুই বছর ধরে গর্ত বন্ধ না করে রেখেছিল। কেন রেখেছিল? আমি তার বিচার চাই…কছিরের শাস্তি চাই।

কছিরকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না প্রশ্ন করলে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, তদন্ত চলছে। আমরা এটা দেখছি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

মায়ের কোল থেকে মৃত্যুর কোলে শিশু সাজিদ

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৪৩:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫

রাকিব ও তার স্ত্রী তাদের দুই বছরের ছেলেকে নিয়ে মাটিতে গেঁথে যাওয়া ট্রলিকে দেখতে যান। শিশুটি তার মায়ের কোল থেকে নেমে জমির মধ্যে হাঁটছিল। কোনো এক সময় পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের ওই গর্তে পড়ে যায় সে।

পরে স্থানীয়রা ছাড়াও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার করতে পারেনি। এরপর ফায়ার সার্ভিসের তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী সদর স্টেশনের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে। তারা শিশু সাজিদকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। শিশুটিকে জীবিত রাখতে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গর্তের পাশে এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি খনন করা হয়।

বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট তিনটি এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি খনন করে। তারা ৪০ ফুট মাটি খনন করেও শিশু সাজিদকে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে রাত ৯টার দিকে শিশুটিকে মাটির নিচ থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার পাচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে সাজিদ গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে নিখোঁজ হয়। এরপর থেকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা শিশু সাজিদকে উদ্ধারে কাজ শুরু করে।

ফায়ার সার্ভিস প্রথম পর্যায়ে চার্জ ভিশন ক্যামেরা দিয়ে প্রায় ৩৫ ফুট পর্যন্ত অনুসন্ধান চালায়। তবে শিশুর অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। এরপর পাশেই এস্কেভেটর দিয়ে রাতভর প্রায় ৩৫ ফুট গভীর বড় একটি গর্ত খনন করা হয়। সকালে সেই গর্ত থেকে নলকূপের দিকে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার চেষ্টা করা হলেও সেখানেও শিশুর অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।

এরপর আবারও পরিত্যক্ত নলকূপে ক্যামেরা নামানো হলে সেটিতে মাটি ছাড়া আর কিছু দেখা যায়নি। এরপর নতুন করে আবারও খননের সিদ্ধান্ত নেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছরখানেক আগে জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ওই নলকূপ খোঁড়া হয়েছিল। পানি না ওঠায় মালিক সেটি মাটি দিয়ে ঢেকে রাখেন। সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে মাটি ধসে পড়ে নলকূপের মুখ আবারও উন্মুক্ত হয়ে যায়। সেই গর্তেই দুর্ঘটনাবশত পড়ে যায় শিশু সাজিদ।

শিশুটির মা রুনা খাতুন জানান, বুধবার দুপুর ১টার দিকে মেজো ছেলে সাজিদের হাত ধরে তিনি বাড়ির পাশের মাঠে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার ছোট একটি সন্তান কোলে ছিল। হাঁটার সময় হঠাৎ সাজিদ ‘মা’ বলে ডেকে ওঠে। পেছনে তাকিয়ে দেখেন, ছেলে নেই, গর্তের ভেতর থেকে ‘মা, মা’ বলে ডাকছে।

গর্তটির ওপরে খড় বিছানো ছিল। ওখানে যে গর্ত ছিল, সেটা বুঝতে পারেননি তিনি নিজে কিংবা শিশু সাজিদ। ওই জায়গায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুটি গর্তের ভেতর পড়ে যায়। লোকজন ডাকাডাকি করতে করতেই গর্তের তলায় চলে যায়।

শিশু সাজিদরা তিন ভাই। বড় ভাই সাদমান স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ভাই সাব্বিরের বয়স মাত্র তিন মাস। বাবা রাকিব গাজীপুরে একটি ঝুট কারখানায় কাজ করেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, তানোরের কোয়েল হাট গ্রামে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এ এলাকায় এখন গভীর নলকূপ বসানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে। এরপরও ওই গ্রামের এক ব্যক্তি তাঁর জমিতে পানির স্তর পাওয়া যায় কি না, সেটা যাচাই করার জন্য গর্তটি খনন করেছিলেন। সেই গর্ত ভরাটও করেছিলেন; কিন্তু বর্ষায় মাটি বসে গিয়ে নতুন করে গর্ত সৃষ্টি হয়। মায়ের সঙ্গে মাঠে গিয়ে শিশুটি সেই গর্তে পড়ে যায়।

সন্তানটিকে একবার দেখা, বুকে জড়িয়ে ধরার আশায় ছিলেন মা। সাজিদের মা রুনা খাতুন দুপুরে ঘরে বসে ছিলেন। বললেন, কছির উদ্দিন তিন জায়গা খুঁড়েছিল…দুই বছর ধরে গর্ত বন্ধ না করে রেখেছিল। কেন রেখেছিল? আমি তার বিচার চাই…কছিরের শাস্তি চাই।

কছিরকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না প্রশ্ন করলে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, তদন্ত চলছে। আমরা এটা দেখছি।