ঢাকা ০৯:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শ্রীমঙ্গলে উদযাপিত হলো গারো সম্প্রদায়ের ‘ওয়ানগালা’ উৎসব

এলিসন সুঙ,মৌলভীবাজার
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১৯:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নানা রকমের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ওয়ানগালা উৎসব পালন করেছে সিলেট বিভাগে বসবাসরত গারো সম্প্রদায়ের আদিবাসীরা। এই উৎসবকে গারো সম্প্রদায়রা বলেন “ওয়ানগালা”বা নবান্ন উৎসব ।জানা যায়, এক সময় গারো পাহাড় এলাকায় জুম চাষ হতো এবং বছরে মাত্র একটি ফসল হতো। তখন ওই জুম বা ধান ঘরে উঠানোর সময় গারোদের শস্য দেবতা ‘মিসি সালজং’কে উৎসর্গ করে।

কিন্তু গারোরা খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রথাটি এখন ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে একত্রে করে পালন করা হয়। এক সময় তারা তাদের শস্য দেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করলেও এখন তারা নতুন ফসল কেটে যিশু খ্রিস্ট বা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করেন।

এই উৎসব মুখর ধারাবাহিকতায় রোববার (৭ডিসেম্বর ) শ্রীমঙ্গল উপজেলা অধীনে ফুলছড়া গারোপাড়ায় জাঁকজমক ভাবে দিনব্যাপী পালন করেন এ ওয়ানগালা উৎসব ।এই ওয়ানগালায় খামাল(পুরোহিত)হিসাবে ফাদার জেমস শ্যামল গমেজ সিএসসি, ফাদার মার্কুস মুর্মু, ফাদার খোকন বারো সিএসসি, ফাদার বার্ণাড টিউস নকরেক, ফাদার ফ্রান্সিসকো রিজ্জুকে গারো সম্প্রদায়ে কৃষ্টিগত নিয়মে তাদেরকে গ্রহণ করে নেন। তারপরে তারা এই ওয়ানগালার মুলপর্বের পবিত্র খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ করেন। তারই মধ্যদিয়ে এই ওয়ানগালা প্রথম পর্বটি শুরু হয়।

খ্রীষ্টযাগের শুরুতেই বেদির পাশে তৈরিকৃত পবিত্র ক্রুশে মালোদান ও কুটুপ পড়ানো হয়। সেইসঙ্গে উৎপাদিত প্রথম ফসলগুলো ক্রুশের নিচে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়। গারোদের ১২টি গোষ্ঠীর উদ্দেশে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হয়।।এছাড়াও ওয়ানগালার মূল অনুষ্ঠানের অংশ টক্কা, রুগালা, সাসাতসুআ (ধূপ পুড়ানো) ও উৎপাদিত ফসল আর্শীবাদ প্রদান হয় এই খ্রীষ্টযাগে।

খ্রিস্টযাগ শেষে দুপুর ২টায় ওয়ানগালা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন।সভাপতিত্ব করেন গারো শ্রীচুক নকমা এসোসিয়েশন সংগঠনের সভাপতি অনুপ চিসিম এবং সঞ্চালনা করেন এসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক স্যামুয়েল যোসেফ হাজং।

স্বাগত বক্তব্য দেন শ্রীমঙ্গল সাধু যোসেফ ধর্মপল্লীর পাল পুরোহিত ড. ফাদার জেমস শ্যামল গমেজ সিএসসি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মনিপুরী ললিতকলা একাডেমির উপপরিচালক প্রভাস সিংহ, জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক নিলয় রশিদ ও ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ক্লোডিয়া নকরেক কেয়া প্রমুখ ।

এই ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে অতিথিদেরকে নিজস্ব গারো উত্তরীয় ও ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।

এই ওয়ানগালা উদযাপন উপলক্ষে গারো সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা বিচিত্র পোশাক ও পাখির পালক মাথায় দিয়ে লম্বা ডিম্বাকৃতি ঢোলের তালে তালে নাচগান করেন। এটি গারোদের বছরের প্রধান বিনোদনের দিন। ঢোলের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে গারোপাড়াগুলো।

আয়োজক কমিটি উপদেষ্টা মি: ফিলিক্স আাশাক্রা বলেন, গারোরা পাহাড়ি এলাকায় একসময় জুম চাষ করতো এবং বছরে মাত্র একটি ফসল হতো। তখন ওই জুম বা ধান ঘরে ওঠানোর সময় গারোদের শস্য দেবতা ‘মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে এ উৎসবের আয়োজন করা হতো।মূলত গারোরা ছিল প্রকৃতিপূজারী কিন্তু কালের পরিক্রমায় গারোরা ধীরে ধীরে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রথাটি এখন ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে একত্রে পালন করা হয়। এক সময় তারা তাদের শস্য দেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে ‘ওয়ানগালা’ পালন করলেও এখন তারা নতুন ফসল কেটে যিশু খ্রিস্ট বা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে ‘ওয়ানগালা’ পালন করে থাকেন।’ওয়ানগালা’ অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য খ্রিস্টভক্ত গারাগানজিং, কতচু, রুগা, মমিন, বাবিল, দোয়াল, মাতচি, মিগাম, চিবক, আচদং, সাংমা, মাতাবেং ও আরেং নামে ১২টি গোত্রের গারো সম্প্রদায়ের লোকজনসহ প্রায় এক হাজার জন এ ওয়ানগালায় উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

শ্রীমঙ্গলে উদযাপিত হলো গারো সম্প্রদায়ের ‘ওয়ানগালা’ উৎসব

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১৯:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫

নানা রকমের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ওয়ানগালা উৎসব পালন করেছে সিলেট বিভাগে বসবাসরত গারো সম্প্রদায়ের আদিবাসীরা। এই উৎসবকে গারো সম্প্রদায়রা বলেন “ওয়ানগালা”বা নবান্ন উৎসব ।জানা যায়, এক সময় গারো পাহাড় এলাকায় জুম চাষ হতো এবং বছরে মাত্র একটি ফসল হতো। তখন ওই জুম বা ধান ঘরে উঠানোর সময় গারোদের শস্য দেবতা ‘মিসি সালজং’কে উৎসর্গ করে।

কিন্তু গারোরা খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রথাটি এখন ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে একত্রে করে পালন করা হয়। এক সময় তারা তাদের শস্য দেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করলেও এখন তারা নতুন ফসল কেটে যিশু খ্রিস্ট বা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করেন।

এই উৎসব মুখর ধারাবাহিকতায় রোববার (৭ডিসেম্বর ) শ্রীমঙ্গল উপজেলা অধীনে ফুলছড়া গারোপাড়ায় জাঁকজমক ভাবে দিনব্যাপী পালন করেন এ ওয়ানগালা উৎসব ।এই ওয়ানগালায় খামাল(পুরোহিত)হিসাবে ফাদার জেমস শ্যামল গমেজ সিএসসি, ফাদার মার্কুস মুর্মু, ফাদার খোকন বারো সিএসসি, ফাদার বার্ণাড টিউস নকরেক, ফাদার ফ্রান্সিসকো রিজ্জুকে গারো সম্প্রদায়ে কৃষ্টিগত নিয়মে তাদেরকে গ্রহণ করে নেন। তারপরে তারা এই ওয়ানগালার মুলপর্বের পবিত্র খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ করেন। তারই মধ্যদিয়ে এই ওয়ানগালা প্রথম পর্বটি শুরু হয়।

খ্রীষ্টযাগের শুরুতেই বেদির পাশে তৈরিকৃত পবিত্র ক্রুশে মালোদান ও কুটুপ পড়ানো হয়। সেইসঙ্গে উৎপাদিত প্রথম ফসলগুলো ক্রুশের নিচে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়। গারোদের ১২টি গোষ্ঠীর উদ্দেশে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হয়।।এছাড়াও ওয়ানগালার মূল অনুষ্ঠানের অংশ টক্কা, রুগালা, সাসাতসুআ (ধূপ পুড়ানো) ও উৎপাদিত ফসল আর্শীবাদ প্রদান হয় এই খ্রীষ্টযাগে।

খ্রিস্টযাগ শেষে দুপুর ২টায় ওয়ানগালা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন।সভাপতিত্ব করেন গারো শ্রীচুক নকমা এসোসিয়েশন সংগঠনের সভাপতি অনুপ চিসিম এবং সঞ্চালনা করেন এসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক স্যামুয়েল যোসেফ হাজং।

স্বাগত বক্তব্য দেন শ্রীমঙ্গল সাধু যোসেফ ধর্মপল্লীর পাল পুরোহিত ড. ফাদার জেমস শ্যামল গমেজ সিএসসি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মনিপুরী ললিতকলা একাডেমির উপপরিচালক প্রভাস সিংহ, জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক নিলয় রশিদ ও ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ক্লোডিয়া নকরেক কেয়া প্রমুখ ।

এই ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে অতিথিদেরকে নিজস্ব গারো উত্তরীয় ও ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।

এই ওয়ানগালা উদযাপন উপলক্ষে গারো সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা বিচিত্র পোশাক ও পাখির পালক মাথায় দিয়ে লম্বা ডিম্বাকৃতি ঢোলের তালে তালে নাচগান করেন। এটি গারোদের বছরের প্রধান বিনোদনের দিন। ঢোলের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে গারোপাড়াগুলো।

আয়োজক কমিটি উপদেষ্টা মি: ফিলিক্স আাশাক্রা বলেন, গারোরা পাহাড়ি এলাকায় একসময় জুম চাষ করতো এবং বছরে মাত্র একটি ফসল হতো। তখন ওই জুম বা ধান ঘরে ওঠানোর সময় গারোদের শস্য দেবতা ‘মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে এ উৎসবের আয়োজন করা হতো।মূলত গারোরা ছিল প্রকৃতিপূজারী কিন্তু কালের পরিক্রমায় গারোরা ধীরে ধীরে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রথাটি এখন ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে একত্রে পালন করা হয়। এক সময় তারা তাদের শস্য দেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে ‘ওয়ানগালা’ পালন করলেও এখন তারা নতুন ফসল কেটে যিশু খ্রিস্ট বা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে ‘ওয়ানগালা’ পালন করে থাকেন।’ওয়ানগালা’ অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য খ্রিস্টভক্ত গারাগানজিং, কতচু, রুগা, মমিন, বাবিল, দোয়াল, মাতচি, মিগাম, চিবক, আচদং, সাংমা, মাতাবেং ও আরেং নামে ১২টি গোত্রের গারো সম্প্রদায়ের লোকজনসহ প্রায় এক হাজার জন এ ওয়ানগালায় উপস্থিত ছিলেন।