স্ট্যান্ড রিলিজ বাতিল, প্রাইজ পোস্টিং পেলেন ‘শিমুলের লোক’
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:১৩:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ ৯২ বার পড়া হয়েছে
অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নাটোর সদর উপজেলা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী সামসের আলীকে তাৎক্ষণিক বদলি (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়েছিল । বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) তার যোগ দেওয়ার কথা ছিল কিশোরগঞ্জে। কিন্তু আগের দিন এই প্রকৌশলীর স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ বাতিল করা হয়েছে।
স্ট্যান্ড রিলিজ বাতিল করে তাকে তাকে পাঠানো হয়েছে পার্শ্ববর্তী লালপুর উপজেলায়। এমন প্রাইজ পোস্টিং পাওয়া সমসের আলী নাটোর সদরের সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের লোক হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের এই এমপি নিজেই নাটোরে এলজিইডির সমস্ত কাজ করতেন। তার কাজ তুলে দিতেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক আকরামুল ইসলাম আক্কু ওরফে আক্কু বিহারী এবং এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী সমসের আলী। এভাবে বিপুল অর্থবিত্তের মালিকও হয়েছেন সমসের।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতা আক্কু বিহারী ও এলজিইডির প্রকৌশলী সমসের আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ হয়েছে। অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ও রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন দপ্তরে। এ অভিযোগে ১৮ কোটি টাকার একটি রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, নাটোর এলজিইডির আরসিআইপি প্রকল্পের অধীনে নাটোর সদরের দত্তপাড়া থেকে নাজিরপুর ভায়া হালসা পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার রাস্তার কাজটি নিজেই করেন নাটোরের তৎকালীন এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুল। এ কাজের জন্য খায়রুল কবীর রানা নামের রংপুরের একটি লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়। শিমুলের হয়ে এই কাজ করছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা আক্কু বিহারী ও এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী সমসের আলী। দুই বছর আগে কাজটি শুরু হয়। এরই মধ্যে আওয়ামী সরকারের পতনের পর শিমুল ও তার আস্থাভাজন ঠিকাদার আক্কু বিহারী পালিয়ে যান। পরে একা সমসের কাজটি শেষ করতে পারেননি। ইতোমধ্যে কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এলজিইডি নতুন করে মেয়াদও বাড়ায়নি।
অভিযোগে ওই কাজের সুনির্দিষ্টভাবে ১০টি অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ওই রাস্তাটির কাজে পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী টেন্ডার ইন্স্যুরেন্স করা হয়নি। ইতোমধ্যে যে কাজ হয়েছে তা স্পেশিফিকেশন অনুযায়ী হয়নি। সম্পাদন হয়নি ল্যাব টেস্ট। কাজের পাথরের মান ঠিক নেই। কার্পেটিংয়ের সময় স্টোন ডেস্টের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে বালু। পাড়ে ৫ শতাংশ বিটুমিন দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে বড়জোর ৪ শতাংশ। ওই বিটুমিনও নিম্নমানের। ডব্লিউবিএম থিকনেসও ঠিক নেই। আবার নতুনের জায়গায় পুরনো রাস্তা থেকে তুলে ওই খোয়া আবার ব্যবহার করা হয়েছে নতুন রাস্তায়। অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর অনুপাতও ঠিক নেই এই কাজের ক্ষেত্রে। শিমুলের কাজ বলে কেউ কিছু বলার সাহস পাননি।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, এই অভিযোগ পাওয়ার পর প্রকৌশলী সমসের আলীকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা কার্যালয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাকে কিশোরগঞ্জে যোগ দিতে বলা হয়। কিন্তু সমসের আলী ওই স্ট্যান্ড রিলিজ ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সমসেরের ওই স্ট্যান্ড রিলিজ বাতিল করা হয়। এরপর তাকে নাটোরের লালপুর উপজেলা কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির এক প্রকৌশলী জানান, সাবেক এমপি শিমুলের হয়ে সব কাজই করতেন সমসের আলী। কাজ তুলে দেওয়ার পাশাপাশি এলজিইডির বড় কর্তাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করার কাজটিও করতেন তিনি। শিমুলের কাজ করে দিয়ে তিনি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। নাটোর শহরের কানাইখালিতে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে বানিয়েছেন আলিশান বাড়ি। স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়ার পর তিনি তা ঠেকাতে সমসের আলী মোটা অংকের অর্থ খরচ করেন বলেও এলজিইডির ওই প্রকৌশলী জানিয়েছেন।
অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার সমসের আলী বলেছিলেন, তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। তিনি কিশোরগঞ্জে চলে যাবেন। লালপুরে নতুন বদলির আদেশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘বোঝেনই তো! নাটোরেই বাড়ি, এখানেই থাকতে চাই।’ শিমুলের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এতদিন ক্ষমতায় ছিল। তখন আওয়ামী লীগের বাইরে কেউ ছিল? কেউ এমপিদের কথার বাইরে যেতে পেরেছে?’ সমসের আলী অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ব্যাংক থেকে ৭৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাড়িটা করেছি। বাড়ি ছাড়া আমার কোনো সম্পদ নেই।’
এলজিইডির নাটোর সদর উপজেলা প্রকৌশলী শেখ মো. আবু সাঈদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সমসের আলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছিল। আজ অফিসে এসে দেখছি গতকাল তার সেই আদেশ বাতিল করে তাকে লালপুরে বদলি করা হয়েছে। তিনি এখন অফিসেই আছেন। ছাড়পত্র নিয়ে হয়তো লালপুরে চলে যাবেন।
রাস্তার কাজে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, ‘কাজটা এখনও শেষ হয়নি। এখনও অনেক কাজই বাকি। যদিও মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আমি এসেছি তিনমাস হলো। আগে কী হয়েছে বলতে পারব না।’
এলজিইডির রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গৌতম প্রসাদ চৌধুরী বলেন, ‘সমসেরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগটা আমি সপ্তাহখানেক আগে পেয়েছি। তদন্ত করার জন্য আমি সেটা নাটোরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে দিয়েছি। তদন্ত করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সমসের আলীর স্ট্যান্ড রিলিজ বাতিল করে তার প্রাইজ পোস্টিংয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমি বলতে পারব না। রাজশাহী বিভাগের মধ্যে বদলি হলে সেটা আমি করি। কিন্তু বিভাগের বাইরে গেলে সেটা হেড অফিস থেকে করে। স্ট্যান্ড রিলিজ বাতিল করে নতুন পদায়নও ঢাকা থেকে হয়েছে। এ বিষয়ে আমি এখনও কিছু জানি না।






















