https://bangla-times.com/
ঢাকাশুক্রবার , ১ ডিসেম্বর ২০২৩

বদলেছে পাহাড়ের দৃশ্যপট: থামেনি সংঘাত

বান্দরবান প্রতিনিধি
ডিসেম্বর ১, ২০২৩ ২:০৫ অপরাহ্ণ । ১৩০ জন
Link Copied!

পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৬ বছরে বদলে গেছে পাহাড়ের দৃশ্যপট।সর্বত্র উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে।অর্থনৈতিক স্রোত বৃদ্ধি পায়।১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তি সম্পাদিত হয়।সেদিন প্রাথমিকভাবে শান্তি বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। সরকার তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে।পার্বত্য চুক্তির ফলে বদলে গেছে পাহাড়ের দৃশ্য।দীর্ঘদিনের সংঘাত বন্ধে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করে,উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে।

চুক্তির ফলে তিন পার্বত্য জেলায় গড়ে উঠেছে সরকারী-বেসরকারী অনেকগুলো পর্যটন স্পট ও বড় বড় হোটেল-রেস্তোরাঁ। প্রতিনিয়ত আসছেন দেশি-বিদেশী হাজার হাজার পর্যটক।যোগাযোগা ব্যবস্থার উন্নয়নে দুর্গম পাহাড়ি জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানউন্নয়নসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।এছাড়াও পার্বত্যাঞ্চলে স্কুল,কলেজ,একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়,মেডিকেল কলেজ হয়েছে।

এছাড়াও সীমান্ত সড়ক,বান্দরবান-কেরানীহাট সড়ক, জেলা শহরের প্রবেশ মুখে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টি নন্দন টানেল,জেলার আলীকদম উপজেলার দূর্গম সীমান্তবর্তী এলাকায় নির্মিত হয়েছে দৃষ্টি নন্দন সড়ক।সর্বোপরী অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনগনের আর্থিক ক্ষমতাবৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পাহাড়ে শান্তি বজায় থাকলেও গোষ্ঠী ভিত্তিক দ্বন্ধের জেরে পার্বত্যাঞ্চলে একের পর এক উত্থান হয়েছে নতুন নতুন আঞ্চলিক দলের।

গেল এক দশকে বান্দরবানে আত্ম প্রকাশ ঘটেছে জেএসএস সংস্কার, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ সংস্কার,মগ লিবারেশন পার্টি ও কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট নামে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক সংগঠনের।আর এসব সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জেরে জড়িয়ে পড়ছে গুম, খুন, অপহরণ,চাঁদাবাজি,সন্ত্রাসী কর্মকান্ড,জাতিগত ভেদাভেদ,রাজনৈতিক দ্বন্দ্বসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হতেও পিছপা হচ্ছে না তারা। বিভিন্ন কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে পাহাড়ের পরিবেশ।

 এদিকে বান্দরবানসহ তিন জেলার মধ্যে ‘শান্ত ও ‘সম্প্রীতির জেলা’খ্যাত বান্দরবান।কিন্তু পাহাড়ে সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্ব›দ্ব বেড়েছে। গেল এক বছরে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত ও পারিবারিক কলহে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।অপহরন হয়েছে বেশ কয়েকজন।তবে চুক্তির পর দীর্ঘ ২৬টি বছর সময় কেটে গেলেও পাহাড়ে থামিেন অস্ত্রের ঝনঝনানি। বরং দিন দিন বাড়ছে সংঘাত,খুন, গুমসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড। যার কারণে পাহাড়ে বসবাসকারীদের মনে আতঙ্ক নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে।তবে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বির্তকের শেষ হয়নি।সরকার পক্ষে বলছে,চুক্তির অধিকাংশ ধারাই বাস্তবায়িত হয়েছে।বাকি ধারা গুলোও বাস্তবায়িত হবে। 

জেএসএসের অভিযোগ,সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের পরিবর্তে লঙ্ঘন করছে। আর শান্তি চুক্তি সংশোধনের দাবিতে বাঙ্গালী সংগঠগুলো আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে কারণে প্রায় এক বছরের মত জেলার রুমা,রোয়াংছড়ি,থানচি ও আলীকদম উপজেলায় ছিল পর্যটক ভ্রমনের উপর নিষেধাজ্ঞা।মগ লিবারেশন পার্টি ও কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট সংগঠনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে পাহাড়ী সম্প্রদায়ের লোকজনও এলাকা চেড়ে পালিয়ে জঙ্গলে ও বিভিন্ন আত্মীয়জস্বনের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে।

অপরদিকে স্থানীয় পাহাড়ীদের মতে,শান্তি চুক্তি ফলে পাহাড়ে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।তবে উন্নয়ন ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিষ্টানগুলো আরো ক্ষমতায়ন করতে হবে। তা না হলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যারা রয়েছে তাদের অধিকার নিশ্চিত হবে না। শান্তিচুক্তি শুধু পাহাড়ীদের জন্য নয়,পাহাড়ের বসবাসরত সব মানুষের জন্য।পাহাড়ে শান্তি চুক্তির পর অনেক পরিবর্তন এসেছে।তবে শান্তিচুক্তির পরেও পাহাড়ে চাঁদাবাজি এবং থামেনি অস্ত্রের ঝনঝনানি।পাহাড়ে উন্নয়নের স্বার্থে আরো নজর রাখা দরকার মনে করেন পাহাড়ী নেতারা।

বাংলাদেশ খুমী কল্যান এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ও সদস্য সমাজকর্মী লেলুং খুমী বলেন,পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের যেই প্রতাশা ছিল,সেটা আসলে প্রতিফলিত হয়নি এখন পর্যন্ত।আওয়ামী লীগের সাথে চুক্তি হয়েছে তারা আজ ২০বছর ধরে ক্ষমতায় আছে তারা যদি চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে না আসে,তাহলে বুঝতে হবে চুক্তি বাস্তায়নে সরকারী দলের কোন আন্তরিকতা নেই।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি তসলিম ইকবাল চৌধুরীর মতে,পার্বত্য শান্তিচুক্তি ফলে সীমান্তের নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন,সীমান্তের দুই পাশের অবৈধ অস্ত্র,মাদক,মানব পাচার ইত্যাদিসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রসার,এলাকার সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক সফলতা আসবেন এবং এই সীমান্ত সড়ক পার্বত্য অঞ্চলের জন্য খুবেই গুরুত্বপুন্ন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মুজিবুর রহমান বলেন,শান্তিচুক্তির অনেক গুলো ধারা বাস্তবায়ন হয়েছে।তবে চুক্তিতে বলা হয়েছে অবৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার।কিন্তু অস্ত্র জমা না দেওয়ার কারণে প্রতিনিয়িত হত্যা,গুম-খুন, চাঁদাবাজী হচ্ছে এবং বন্ধ হচ্ছে না সন্ত্রাসী কর্মকান্ড।তিনি আরো বলেন,শান্তি চুক্তির সুফল পাচ্ছে না পাহাড়ের মানুষ।এখানে বিশাল বৈশম্বর মধ্যে রাখা হয়েছে বাঙ্গালীদেরকে।তবে চুক্তি মধ্যে কিছু ধারা রয়েছে,এই ধারাগুলো যদি পরিবর্তন করা না হয়, তাহলে পার্বত্য এলাকা থেকে প্রায় ১২লক্ষ মানুষ বাড়ীঘর চেড়ে চলে যেতে হবে।

অন্যদিকে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক লক্ষী দাশ বলেন,শান্তিচুক্তির ফলে পার্বত্যঅঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।স্কুল,কলেজ,একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়,মেডিকেল কলেজ হয়েছে।সর্বোপরী অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনগনের আর্থিক ক্ষমতাবৃদ্ধি পেয়েছে এবং শান্তিচুক্তির সুফল পাচ্ছে সাধারণ মানুষ।তবে শান্তি চুক্তির প্রায় ধারাগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে, যার কারণে পার্বত্য জেলা পরিষদ সকল সম্প্রদায়ের সদস্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

    উল্লেখ্য,পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের পক্ষে তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরের পর সন্তু লারমার দল চুক্তির ২৬বছর পরও দাবি করে আসছে,চুক্তির মূল ধারার অধিকাংশই বাস্তবায়ন করেনি সরকার।আর সরকার বলছে ধারা-উপধার প্রায় বাস্তবায় করা হয়েছে এবং বাকিগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে।#