https://bangla-times.com/
ঢাকারবিবার , ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

পেঁয়াজে সিন্ডিকেট : ৭ দিনে টার্গেট ৫শ’ কোটি টাকা

বিশেষ প্রতিবেদক
ডিসেম্বর ১০, ২০২৩ ১২:১৩ অপরাহ্ণ । ১৩৭ জন
Link Copied!

ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের খবরে অস্থির দেশের পেঁয়াজের বাজারে। হু হু করে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। এই মূল্যপ্যাঁচে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন ক্রেতা। শুক্রবার থেকে দফায় দফায় বেড়েই চলছে পেঁয়াজের দাম। রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার একদিনের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ১২০ টাকা। রাজধানীর খুচরা বাজারে এখন এ পেঁয়াজের কেজি ২৪০ টাকা। আর কেজিতে ৯০ টাকা বেড়ে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা। কেউ কেউ ২২০ টাকাও দাম হাঁকছেন।

ভারত নিজেদের বাজারে সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রেখেছে ভারত। গত শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা চলবে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত। মূলত এ খবর প্রকাশের পর থেকেই দেশের বাজারে অস্থিরতা বাড়তে থাকে।

জানা গেছে, পেঁয়াজ নিয়ে লাগামহীন মুনাফা করতে এবার শক্তিশালী সিন্ডিকেট সাত দিনের টার্গেট ধরে মাঠে নেমেছে। এ সময়ের মধ্যে চক্রের সদস্যরা ভোক্তার পকেট থেকে পাঁচ শতাধিক কোটি টাকা হরিলুটের পাঁয়তারা করছে। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই এমন ছক আঁকা হয়েছে।

প্রাপ্ত্য তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিদিন দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ৭ হাজার ৬৭১ টন বা ৭৬ লাখ ৭২ হাজার কেজির চাহিদা রয়েছে। প্রতি কেজিতে গড়ে অতিরিক্ত ১০০ টাকা মুনাফা করলে দিনে মুনাফা হচ্ছে ৭৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে ৭ দিনে ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত মুনাফা হিসাবে সিন্ডিকেটের পকেটে যাবে প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকা। আগামী কয়েকদিনে দাম বাড়লে আরও বেশি টাকা চলে যাবে সিন্ডিকেটের কবজায়। এছাড়া পেঁয়াজের এ দাম যদি আরও বেশি দিন স্থায়ী হয়, তাহলে কথিত কারসাজির চক্রটি আরও বেশি মুনাফা করবে। এর আগে শুক্রবারও দাম বাড়িয়ে চত্রুটি আরও কিছুটা মুনাফা করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন রপ্তানি বন্ধের ঘোষণাকে পুঁজি করে পিয়াজ আটকে রেখে মুনাফা লুটছে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি চক্র। গত ৮ই ডিসেম্বর পিয়াজ রপ্তানি আগামী ৩১শে মার্চ পর্যন্ত বন্ধের আদেশ জারি করে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি)। এ খবর দেশের বাজারে ছড়িয়ে পড়লে শুক্রবার রাতেই দেশি পিয়াজের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়ে যায়। শনিবার সকাল থেকে আরেক দফা বাড়ে এই দাম।

এদিকে দেশের ভোগ্যপন্যের প্রধান আড়ত চট্টগ্রামের পাইকারি ও খুচরা বাজারে পেঁয়াজ যেন রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে। আর যাও বা আছে গোডাউনে বা দোকানে তার দামও দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণ হয়ে গেছে। মূলত ভারত সাময়িকভাবে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়ার পরপরই সারাদেশের মতো চট্টগ্রামের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরাও তাদের অসাধু বাণিজ্য কৌশলে নেমে পড়েন। একদিন আগেও শুক্রবার যেসব গুদাম পেঁয়াজে ভর্তি ছিল, সেগুলো হঠাৎ উধাও হয়ে যায়।

রাজধানী ঢাকার কাওরান বাজরের বিক্রমপুর ভাণ্ডার, মায়ের দোয়া বাণিজ্যলয়, আল্লাহর দান বাণিজ্যলয়, সোনার বাংলা বাণিজ্যলয়, আরাফাত ট্রেডার্স, মক্কা ট্রেডার্স, মিনহাজ ট্রেডার্সসহ বিভিন্ন পিয়াজের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে দেশি পিয়াজ। আড়তদার মো. সালাম বলেন, আমরা যাদের কাছ থেকে পিয়াজ কিনে এনে বিক্রি করি, তারা সকলে মাল আটকে ফেলেছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) শনিবারের বাজার প্রতিবেদনেও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে।সংস্থাটি বলছে, শনিবার রাজধানীর খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ১৯০ টাকা এবং আমদানিকৃত পেঁয়াজ ১৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। গত সপ্তাহে দেশি পেঁয়াজ ছিল ১০৫ থেকে ১৩০ টাকা। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১১০ টাকায়।

ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলছেন, দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ভারতের পেঁয়াজ দেশে আসতে তিন থেকে সাত দিন সময় লাগে। ফলে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলেও বাজারে এত দ্রুত তার প্রভাব পড়ার কথা নয়। তা ছাড়া বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ রয়েছে, পাশাপাশি নতুন পেঁয়াজের সরবরাহও বাড়ছে। এর মধ্যে দাম একদিনে ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক। মূলত অসাধু ব্যবসায়ীরা ভারতের রপ্তানি বন্ধের সুযোগ নিচ্ছে।

মিতালী আড়তের কানাই সাহাসহ রাজধানীর শ্যামবাজারের একাধিক পাইকারি ব্যবসায়ী জানান,শনিবার এ বাজারে পাইকারিতে দেশি পেঁয়াজের কেজি ১৭০ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এর বেশিতেও বিক্রি করেছেন কেউ কেউ। অনেকে বিক্রি বন্ধও রেখেছেন। গত সপ্তাহে পাইকারিতে এ পেঁয়াজ ১০০ টাকার কমেও বিক্রি হয়েছে আর আমদানিকৃত পেঁয়াজের দামও বেড়ে শনিবার ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়েছে।

বেশ কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ী জানান, গত এক দিনে দফায় দফায় পাঁচ টাকা, ১০ টাকা করে দাম বেড়েছে। মূলত এখানকার অনেক ব্যবসায়ী ‘কমিশন বাণিজ্য’ করেন।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, পেঁয়াজের বাজারে যেটা হচ্ছে, সেটাকে ব্যবসা বলা যাবে না। এটাকে ডাকাতি বলব, নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন সন্তোষজনক। পুরনো পেঁয়াজ এখন পাওয়া যাচ্ছে, নতুন পেঁয়াজ উঠছে। তা ছাড়া বাজারে যে পেঁয়াজ রয়েছে সেগুলো আগের দামে কেনা। অথচ ভারত ঘোষণা দিতেই আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সিন্ডিকেটচক্র। গায়েবি ফোনকল বা এসএমএসে দাম বাড়ছে। ক্রয়-বিক্রয়ে রশিদ নেই। এসব তদারকিতেও তৎপরতা দেখা যায় না।

রাতারাতি দাম বাড়ায় অনেক পাইকারি বিক্রেতা পণ্য মজুদ করছেন- এমন অভিযোগও উঠেছে। কদমতলী এলাকার মো. মিলন হোসেনসহ আরও অনেক খুচরা বিক্রেতা জানান, শুক্রবার থেকে প্রতিঘণ্টায় দাম বাড়ছে। চাহিদা দিয়েও কাক্সিক্ষত পেঁয়াজ মিলছে না। অনেক পাইকার মোবাইল ফোন বন্ধ রেখে বিক্রি বন্ধ রেখেছে। যেটুকু দেশি পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, তার প্রতি মণের দাম পড়ছে ৮ হাজার টাকার আশপাশে। কয়েক দিন আগে যা ৪ হাজার ৫০০ টাকার আশপাশে কেনা গেছে।

শ্যামবাজার পেঁয়াজ পাইকার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল মাজেদ বলেন, ‘দেশে যতটুকু উৎপাদন হয় তা দিয়ে চাহিদা পুরোপুরি মেটে না; আমাদনি করতে হয়, যার বড় অংশ ভারত থেকে আসে। সেখানে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় দেশের বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে।’

জানা গেছে, রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার পর শনিবার ভারত থেকে ২০ ট্রাক পেঁয়াজ সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করেছে। প্রতি ট্রাকে ৩০ টন করে পেঁয়াজ রয়েছে। আরও কিছু ট্রাক ভারতের ঘোজাডাঙ্গা পারে থাকলেও আর আসবে না বলে জানা গেছে।

অপরদিকে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আগে এলসি করা ২৬টি ট্রাকে ৭৪৩ টন পেঁয়াজ এসেছে। আরও কিছু ট্রাক প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে কেজিতে পেঁয়াজের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। হিলিতে একরাতেই পেঁয়াজের কেজিতে ৯০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

হু হু করে বাড়তে থাকা পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ লক্ষ্যে ঢাকাসহ সারাদেশে জোরদার অভিযান চালানো হয়। পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রিতে অনিয়মের অপরাধে ১৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ক্যাবের সহ-সভাপতি নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিবছর সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে পেঁয়াজ নিয়ে এমনটা ঘটছে। এ সময় ভারত থেকেও মূল্যবৃদ্ধিসহ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার পরও আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে, বিশেষ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আগাম কোনো পরিকল্পনা কেন থাকছে না, তা বোধগম্য নয়। তা ছাড়া আমরা দেখেছি, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ্য প্রধান্য পাচ্ছে বেশি, ফলে ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। এ সংবাদের পর কিছু ব্যবসায়ী কম দামে কেনা পেঁয়াজ দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। তাই মূল্য নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদারকি করা হচ্ছে। এ সময় ক্রয় ও বিক্রয় রসিদ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম পেলে আইনের আওতায় এনে জরিমানা করা হচ্ছে।তিনি জানান, সাত দিন পর দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ পুরোপুরি বাজারে এসে যাবে। তখন দাম এমনিতেই কমে আসবে।