https://bangla-times.com/
ঢাকাশনিবার , ১৩ জানুয়ারি ২০২৪
  • অন্যান্য

জাপার দুর্গে বিপর্যয় ও দলের ভবিষ্যৎ

রংপুর প্রতিনিধি
জানুয়ারি ১৩, ২০২৪ ৭:০০ অপরাহ্ণ । ১৩৩ জন
Link Copied!

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি রংপুরকে তাদের দাবি করা দুর্গে চরম ভরাডুবি ঘটেছে। রংপুরের ৬টি আসনের মধ্যে মাত্র একটি সহ পুরো বিভাগের ৩৩ টি আসনের মধ্যে মাত্র ৩টিতে জাপার প্রার্থীরা জয়ী হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২৭টি আসনে জাপার প্রার্থীরা জামানত পর্যন্ত হারিয়েছে।

জাতীয় পার্টির তৃনমূল পর্যায়ের নেতা কর্মীদের মুল্যায়ন হলো পরাজয়ের মূল কারন দলের উপজেলা থেকে তৃনমুল পর্যায়ে সাংগঠনিক কোন কাঠামো না থাকা। নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে পুলিং এজেন্ট না দেবার সীমাহিন ব্যার্থতা, দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত এরশাদের মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা , রাজনৈতিক ভাবে সরকারী দলের লেজুরবৃত্তির অভিযোগে সাধারণ মানুষের মাঝে দল সম্পর্কে বিরুপ ধারনা তৈরী হওয়া। এছাড়াও দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, সহ নানান কারনে এরশাদ প্রতিষ্ঠিত দলটির জনপ্রিয়তা এখন তলানীতে নেমে এসেছে। জাপার যে রাজনৈতিক ভাবে কোঁমড় ভেঙ্গে পড়েছে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হলে দলটির রাজনৈতিক বিলুপ্তি ঘটবে বলে তৃনমুল পর্যায়ের নেতা কর্মীরা আশংকা প্রকাশ করেছেন।

জাপার দুর্গে ৯টি আসনে আওয়ামী লীগ ছাড় দিলেও পেয়েছে ৩টি আসন। অপরদিকে, জাপার সাথে আওয়ামী লীগের আসন সমঝোতার কারনে জাপাকে ছাড় দেয়া ২৬ আসনের মধ্যে রংপুর বিভাগে ছিল ৯টি। এর মধ্যে মাত্র ৩টি আসনে জয়ী হয়েছে জাপার প্রার্থীরা।

এরা হলেন রংপুর-৩ আসনে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং কুড়িগ্রাম-১ আসনে এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান। বাকী ৬টি আসনের জাপা প্রার্থীরা শোচনীয় ভাবে পরাজিত হন এবং তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

ছাড় পাওয়া যে ৬টি আসনে পরাজিত হয়েছে সে গুলো হলো নীলফামারী-৩ আসনে রানা মোহাম্মদ সোহেল, নীলফামারী-৪ আসনে আহসান আদেলুর রহমান, রংপুর-১ আসনে হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ, কুড়িগ্রাম -২ আসনে পনির উদ্দিন আহমেদ, গাইবান্ধা-১ আসনে শামীম পাটোয়ারী এবং গাইবান্ধা-২ আসনে মো. আব্দুর রশিদ পরাজিত হয়েছেন। লালমনিরহাটের সদর আসনে জিএম কাদের দুবার সংসদ সদস্য থাকলেও এবার ওই আসনটি জাপার হাত ছাড়া হয়ে গেছে। পরাজিত হয়েছে জাপা প্রার্থী।

গাইবান্ধাও একসময় জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাটির্ ছিল। এবার এ জেলার পাঁচটি আসনের দুটিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা হলেও গাইবান্ধা-১ আসনে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ও গাইবান্ধা-২ আসনে আব্দুর রশিদ সরকার পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ আর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে।

একই অবস্থা নীলফামারীতেও। এ জেলার চারটি আসনেই ভরাডুবি হয়েছে জাপার। এরশাদ পরিবারের সদস্য ও বর্তমান এমপি আহসান আদেলুর রহমানকে আওয়ামী লীগ ছাড় দিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন তিনি। নীলফামারীর চারটি য় আসনের দুটি আসনে আওয়ামী লীগের ও দুটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছে।

অপরদিকে, কুড়িগ্রামের চারটি আসনের একটিতে জাতীয় মাত্র ১টি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তফাফিজুর রহমান জয়ী হয়েছেন। বাকি তিনটির দুটিতে আওয়ামী লীগের নৌকা ও একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। কুড়িগ্রাম জেলার ৪টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২টি আসনে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও একটি আসন ছাড়া সব কয়েকটি আসনে তারা পরাজিত হয়েছেন।

জাপার উত্থান ও পতন: জাপার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মী সমর্থক আর শুভানুধ্যায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ১৯৯০ সালে এরশাদের ক্ষমতা ত্যাগ করার পর তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে আটক রাখা নির্বাচনে অংশ নিতে না দেবার চেষ্টা মনোনয়ন পত্র বাতিল করে দেয়া সহ বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এরশাদের প্রতি রংপুর জেলায় জনবিস্ফোরন ঘটে। ফলে বাধ্য হয় তার মনোনয়ন পত্র বহাল রাখতে। সেই আন্দোলনের ঢেউ পুরো রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে এরশাদ দুবার রংপুরের ৫টি আসনে প্রার্থী হয়ে ৫টি আসনেই জয়ী হয়। শুধু তাই নয় রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলার ২২টি আসনেই জয়ী হয় জাপার প্রার্থীরা। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকে জাপার নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া সহ বিভিন্ন কারনে দলের জনপ্রিয়তায় ধস নামা শুরু হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের সাথে জাপার সমঝোতা হয়। গঠিত হয় মহাজোট ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ৩২ আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবারো মহাজোটগত ভাবে আওয়ামী লীগের সাথে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেয় জাপা। সেই নির্বাচনে জাপার প্রার্থীরা সারা দেশে ২০টি আসনে বিনা প্রতিদ্বদ্বিতায় জয় লাভ করে। এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ১৩টি আসনে জয়ী হয়ে মোট ৩৩টি আসনে জয়ী হয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একই ভাবে ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয় ২৯টি আসন। তারা ২২টি আসনে জয়লাভ করে। এ ভাবেই তাদের আসন সংখ্যা কমতে কমতে এবার সারা দেশে ২শ ৮৩টি আসনে প্রতিদ্বদ্বিতা করে মাত্র ১১টি আসনে জয় লাভ করে।

রংপুরের ৬টি আসনে ১৯৯০ সাল থেকে সদর ৩ আসনটি এরশাদ ২০১৮ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করে। শুধু একবার অস্ত্র অস্ত্র মামলায় সাজা হওয়ায় তার পরিবর্তে জিএম কাদের জয় লাভ করে। বাকী ৫ টি আসনের মধ্যে রংপুর ১ , ২ ও ৪ ও ৫ আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে থাকলেও ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয়পার্টির হাত ছাড়া হয়ে যায় রংপুর ২, ৪ ও ৫ আসন। ওই আসন গুলোতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় লাভ করে। শেষ পর্যন্ত রংপুর ১ ও সদর আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে থাকে। তৃনমুল পর্যায়ের নেতা কর্মীরা জানান ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে যারা রংপুরে ছিলেন তারা পুরো জেলায় দলের সাংগঠনিক কাঠামো তৈরী ত্যাগি নেতা কর্মীদের অবমুল্যায়ন করায় দলের উপজেলা থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ে চরম স্থবিরতা তৈরী হয়। যার ফলশ্রুতিতে রংপুর সদর ৩ আসন ছাড়া বাকী ৫টি আসনের ৭টি উপজেলায় জাতীয় পার্টির কার্যক্রম ছিলোইনা বললে চলে। এসব কারনে এবার বিগত ৬টি সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির দখলে থাকা রংপুর ১ আসনটি এবারের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে হাত ছাড়া হয়ে যায়। রংপুর-১ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের ভাতিজা আসিফ শাহারিয়ায় শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়। তার জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। রংপুর সদর ৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের জয়ী হন।

অপরদিকে, রংপুর বাকী ৪ আসনের মধ্যে শুধু মাত্র রংপুর ৪ আসনের প্রার্থী মোস্তফা সেলিম বেঙ্গল ছাড়া রংপুর ২, ৫ ও ৬ আসনের জাপা প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয় তারা সকলেই পরাজিত হন শোচনীয় ভাবে। তৃনমূল পর্যায়ের নাম প্রকাশে অনিশ্চুক কয়েকজন নেতা জানান রংপুর জাপার দূর্গ ছিলো এটা যেমন সঠিক তেমনি সেই দূর্গ এখন অতীত ইতিহাস হয়ে গেছে। গত ১৫ বছরে জাপার শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা কেউই এসব এলাকায় আসেননি। তার পরেও এরশাদের প্রতি সাধারণ মানুষের যে সহানুভূতি ছিলো তিনি মারা যাবার পর দলের শীর্ষ নেতারা এরশাদের সেই ইমেজকে কাজে লাগাতে পুরোপুরি ব্যার্থ হওয়ায় জন বিচ্ছিন্ন দলে পরিনত হয়েছে জাতীয় পার্টি।

জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের যা বলেন: নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনার পর রংপুর নগরীর নিউ সেনপাড়াস্থ স্কাইভিউ বাসায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও রংপুর সদর ৩ আসনের নব নির্বাচিত এমপি জিএম কাদের জাতীয় পার্টির দূর্গ এখনও আছে বলে দাবি করে বলেছেন আওয়ামী লীগ যে সব কথা বলে আশ্বাস দিয়ে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে বলেছিলো তার কোনটাই বাস্তবায়ন করেনি তারা। গত সোমবার রংপুর নগরীর স্কাই ভিউ বাসভবনে এ প্রতিনিধি সহ কয়েকটি গনমাধ্যমকে তিনি বলেছেন তারা ২৬টি আসনে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছিলো ঠিক। কিন্তু শুধু মাত্র তার আসন ছাড়া বাকী ২৫টি আসনেই আওয়ামী লীগ তাদের দলের প্রভাবশালী নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমাদের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়নি তারা। শুধু তাই নয় ছাড় দেবার নামে প্রহসন করেছে সরকার। আমরা এমন ছাড় চাইনি কিন্তু তারা যে প্রহসন করেছে নির্বাচনের আগে থেকে আমাদের প্রার্থীদের উপর হামলা নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্র দখল জোর করে ব্যালটে সীল মেরে নিয়ে তাদের প্রার্থীদের জয়ী করা হয়েছে। এর পরিনাম আওয়ামীলীগ বুঝতে পারবে কারন ভবিষতে তাদের কেউ আর বিশ্বাস করবেনা। তিনি দাবি করেন রংপুর অঞ্চলের ২২টি আসনে এখনও জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা অক্ষুন্ন আছে ববেং থাকবে।

এ ব্যাপারে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সাথে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আবারো দাবি করেন আওয়ামী লীগ জোর করে তাদের প্রার্থীদের পরাজিত করিয়েছে। জাপা আবারো মাথা তুলে দাঁড়াবে বলে আশাবাদী তিনি।